ঘসেটি বেগম

‘আমার রাজ্য নাই, তাই আমার কাছে রাজনীতিও নাই। আমার বুকে দয়া নাই, মায়া নাই, স্নেহ নাই, মমতা নাই_আছে শুধু প্রতিহিংসা। এই প্রতিহিংসা আমার পূর্ণ হবে সেই দিন, যে দিন তোমার এই প্রাসাদ অপরে অধিকার করবে, তোমাকে ওই সিংহাসন থেকে ঠেলে ফেলে শওকত জঙের মতো কেউ যে দিন তোমাকে…।’

ঘসেটি বেগম সাহিত্য, চলচ্চিত্র বা নাটকপ্রসূত চরিত্র নয়। ঐতিহাসিক চরিত্র। কিন্তু নাটক, চলচ্চিত্র বা সাহিত্যে দাপটের সঙ্গেই নানা সময়ে নানাভাবে তিনি উপস্থিত এবং সুঅর্থে নয়, কুঅর্থেই। সাহিত্য বা ইতিহাসে খলচরিত্র অপ্রাসঙ্গিক নয়। সৎকে মজবুত ভিত দিতে অসতের উপস্থিতি শুধু বাংলা নয়, বিশ্বসাহিত্যেই অনিবার্য হয়েছে অসাধারণ সব সাহিত্যিকের সৃজনশীল রচনায়। আর ইতিহাসে নিজ স্বার্থ জায়েজ করতে ব্যক্তি শুধু নয়, সমষ্টির পতনেও পিছপা হননি এমন ব্যক্তির নজির দুর্লভ নয়। তেমনই এক ব্যক্তি, একজন নারী ঘসেটি বেগম। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের, পলাশির আমবাগান ট্র্যাজেডির এক প্রভাবশালী খল চরিত্র তিনি। সিরাজের পরাজয়ের পেছনে ছিল যে ষড়যন্ত্র, তার একটা বড় অংশের হিস্যা ছিল তাঁর। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে মীর জাফর, রাজবল্লভ, জগৎ শেঠদের সঙ্গে ঘোট পাকিয়ে ঘসেটি পুরো বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতাটাই বিলিয়ে দিলেন ব্রিটিশ বেনিয়ার হাতে। অথচ সম্পর্কে তিনি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার আপন বড় খালা!
সৃজনশীল নাট্যসাহিত্যে পলাশীর যুদ্ধটা এসেছিল সিরাজকে মূল চরিত্র করে। তার সঙ্গে আসে সে যুদ্ধের খল চরিত্রগুলো। বাংলা নাটক ও মঞ্চের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিভা গিরিশচন্দ্র ঘোষ ১৯০৫-এ সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে নাটক লেখেন। ১৯৩৮ সালে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তও লেখেন ‘সিরাজদ্দৌলা’। বর্তমান আলোচনায় শচীন্দ্রনাথের নাটকটিকেই অবলম্বন করা হয়েছে। তিনি এখানে সিরাজকে ট্র্যাজিক চরিত্র হিসেবেই শুধু দেখেননি, তাঁর মধ্যে জাতির ট্র্যাজেডি চিত্রটিও আঁকেন বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই। এ ক্ষেত্রে তিনি ইতিহাসের সঙ্গে মিশিয়েছেন কল্পনাকেও, কিন্তু সে কল্পনা ইতিহাসবিরোধী নয়। নাটকটির নিবেদন অংশে তাই নাট্যকার নিজেই লেখেন ‘ইতিহাস ঘটনাপঞ্জি’। নাটক তা নয়। ঐতিহাসিক লোকের ঘটনাবহুল জীবনের মাত্র একটি ঘটনা অবলম্বন করেও একাধিক নাটক রচনা করা যায়। যায় এ জন্যই যে ঘটনা নয়, ঘটনাটি ঘটার কারণই নাট্যকারের বিষয়বস্তু। সে ‘ঘটার’ কারণ অনুসন্ধান করতেই সিরাজের পাশাপাশি ঘসেটি চরিত্রটিও নাটকে উঠে এসেছে সমান গুরুত্বের সঙ্গেই। তাই নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যেই আমাদের দেখা হয় তাঁর রাজবল্লভের সঙ্গে কথোপকথনরত অবস্থায়। জানা হয়, তাঁর মতিঝিলের বাড়িটি সাজিয়ে দিয়ে গেছেন ইংরেজ বেনিয়া ওয়াটসের বউ। প্রকাশিত হয় তাঁর সিরাজবিরোধী ইংরেজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও। তাঁর চেহারা-সুরতের কোনো বর্ণনা নাটক কি ইতিহাসগ্রন্থে সুলভ না হলেও তিনি সম্ভবত সুশ্রীই ছিলেন। নাটকের এ অংশে সাজগোজ করার পর তাঁকে কেমন লাগছে সে বিষয়েও তিনি জানতে চান রাজবল্লভের কাছে। তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়ের ‘পলাশির যুদ্ধ’ গ্রন্থে তাঁর ব্যক্তিচরিত্র সম্পর্কেও জানান এক চমকপ্রদ তথ্য, নবাব হওয়ার আগেই নাকি এক দিন প্রকাশ্য রাজপথে হোসেন কুলী খাঁ নামের এক ব্যক্তিকে সিরাজ খুন করেন; এ ব্যক্তির সঙ্গে ঘসেটির গুপ্ত প্রণয় ছিল বলে লোকের মধ্যে আলোচনা ছিল। ঘসেটির এ বিষয়ে দুর্নামও ছিল বেশ। এ নিয়েও হয়তো সিরাজের বিরুদ্ধে ঘসেটির অন্তরে ছিল চাপা এক প্রদাহ।
আলিবর্দী খাঁর কোনো ছেলে ছিল না, ছিল তিন মেয়ে। ছোট মেয়ে আমেনা বেগমের ছেলে সিরাজ। কিন্তু বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম ছিলেন নিঃসন্তান। তাই সিরাজেরই ছোট ভাই আক্রামউদ্দৌল্লাকে পোষ্য নিয়েছিলেন। চেয়েছিলেন এ ছেলেই আলিবর্দীর পর হোক নবাব। তা হলে হয়তো পর্দার আড়ালে বসে বাংলার শাসনযন্ত্রটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে তাঁর পক্ষে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অল্পবয়সেই বসন্তরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় আক্রামের। তাই ওই ইচ্ছা তাঁর থেকে যায় অপূর্ণই। আক্রামের মৃত্যুশোকে ঘসেটি বেগমের স্বামী ঢাকার গভর্নর নোয়াজিশ খাঁও কিছুদিন পর মৃত্যুবরণ করেন। তার দুই মাস পর আলিবর্দীর মেজ জামাই সৈয়দ মোহাম্মদও মারা যান। তখন ঘসেটির শেষ অবলম্বন মেজ বোনের ছেলে শওকত জঙ। কিন্তু বাবার জায়গায় শওকত পুর্নিয়ার নবাব হলে সিরাজের নবাব হওয়ার পথটা হয়ে যায় নিষ্কণ্টক। ঘসেটির রাজদ্রোহ তখন পায় এক গনগনে চেহারা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। তাই রাজবল্লভের কাছেই তাঁকে আক্ষেপ করতে শোনা যায়, ‘উঃ! আপনার কথায় বিশ্বাস করে কী নির্বোধের মতোই কাজ আমি করেছি। সিংহাসনে সিরাজ সুপ্রতিষ্ঠিত হবে জানলে আমি আপনাদের দলে যোগ দিতাম না। সিরাজের প্রতি স্নেহ দেখিয়ে আমি সহজেই সিরাজের বিশ্বাসের পাত্রী হতে পারতাম! আপনাদের শক্তির ভরসায়, আপনাদের প্ররোচনায়, আমি সে পথেও কাঁটা দিয়ে রেখেছি।’
সিরাজও জানতেন তাঁর এসব দুরভিসন্ধির কথা। তাই সিংহাসনে বসেই প্রথম চোটটাই নিলেন ঘসেটির ওপর। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ধনদৌলত-লোকলস্কর নিয়ে মুর্শিদাবাদের দক্ষিণে মতিঝিলের ওপর এক প্রকাণ্ড বাড়ি হাঁকিয়ে রাজার হালে বাস করছিলেন। কিন্তু সিরাজ তাঁর ওপর প্রসন্ন ছিলেন না কখনোই। এত দিন আলিবর্দী খাঁ-ই ছিলেন বড় বাধা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সে বাধা আর থাকল না। সিরাজ জানতেন আক্রামউদ্দৌলাকে নবাব করতে আটঘাট বেঁধে লেগেছিলেন তিনি। এখন তাঁর চোখ পড়েছে শওকত জঙের ওপর। তাঁকেই সিরাজের স্থলাভিষিক্ত করতে আঁটছেন ফন্দি। সে সুযোগ ঘসেটিকে তিনি আর দিতে চাইলেন না। আসলে আলিবর্দী খাঁর মৃত্যুর আগেই সিরাজবিরোধী দলটা যে তাঁকে কেন্দ্র করেই ডালপালা ছড়াচ্ছে, সে বিষয়েও অবগত ছিলেন সিরাজ। সেসবের বদলা নিতে এবং নিজ নবাবির ভিতটা পোক্ত করতে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো সিরাজ এবার চড়াও হলেন ঘসেটির মতিঝিলের বাড়িতে। তপনমোহনের ভাষ্যে, সৈন্যসামন্ত সব কয়েদ করে ধনসম্পত্তি সব নিলেন লুটে। স্বামীর দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অর্থ-ধনরত্ন সব চলে গেল নবাবের হাতে। ঘসেটির প্রাণ বাঁচলেও মান বাঁচল না। হলেন সিরাজের অন্তঃপুরে নজরবন্দি। তার ওপর নোয়াজিশ খাঁর মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগমের ঢাকার দেওয়ান ছিলেন যে রাজবল্লভ, সে মুর্শিদাবাদ এলে সিরাজ কয়েদ করেন তাকেও। এসব ঘটনার অভিঘাত আরো উসকে দিল ঘসেটি বেগমকে। খেপে হলেন আগুন।
এবার পেছন থেকে শওকত জঙকে উসকে দেওয়ার খেলায় নামলেন ঘসেটি। শওকতও বিশ্বাস করতেন নবাবি পদটা তাঁরই পাওনা। সিরাজকে তিনি যে নবাব বলে স্বীকার করেন না, এ বিষয়টা ছিল প্রকাশ্য। তাই ঘসেটিরই প্ররোচনায় ১৭৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর নবাবে-জঙে বাধে ঘোর যুদ্ধ। বেদম ভাঙ খেয়ে হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধের ময়দানে এলেন শওকত। তারপর যা হওয়ার তাই_সিরাজের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরার আগেই গোলার আঘাতে তাঁর মাথার খুলিটা গেল উড়ে। শওকতের নবাবির আশার এখানেই ইতি। কিন্তু হাল ছাড়লেন না ঘসেটি। তাঁর আঁতাত অটুট থাকল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মারফতে ইংরেজের সঙ্গে। সিরাজের অন্তঃপুরে নজরবন্দি অবস্থায়ও ছড়াতে লাগলেন বিষবাষ্প।
তারই ছবিটা শচীন্দ্রনাথ এঁকেছেন নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে। সেখানে বসেও তিনি ভুলতে পারেন না মাতা হওয়ার অভিলাষটা। এবার সিরাজ, লুৎফা আর ঘসেটির কথোপকথন। ঘসেটিকে এখানে বলতে শুনি, ‘অপরকে বঞ্চিত করে যে সিংহাসন পেয়েছ, সে সিংহাসন তোমাকে শান্তি দেবে ভেবেছ?’ অথবা লুৎফাকে কাঁদতে দেখে, ‘আজকের এ কান্না শুধু বিলাস। চোখের জলে নবাব পথ দেখতে পাবেন না। বেগমকে আজীবন আমারই মতো কেঁদে কাটাতে হবে। আমিনা কেঁদে কেঁদে অন্ধ হবে। পলাশি-প্রান্তরে কোলাহল ছাপিয়ে উঠবে ক্রন্দন রোল।’ বিস্মিত, হতবিহ্বল সিরাজ প্রশ্ন করেন, ‘ওই ঘসেটি বেগম মানবী না দানবী?’ এর জবাবে লুৎফার মুখ দিয়েই যেন শচীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করেন ঘসেটি চরিত্রটা, ‘ওর নিঃশ্বাসে বিষ, ওর দৃষ্টিতে আগুন, ওর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ভূমিকম্প।’
মোগল হেরেমের নারী-রাজদ্রোহের বল্গাহীন ঘোড়াটিই যেন ছুটে এসে ঢুকেছিল বাংলার নবাবের অন্তঃপুরেও। তার লাগাম টানতে পারেননি সিরাজও। তাই পলাশীতে জয় হয়েছিল খলেরই। সেই আম্রকাননে এক বিষবৃক্ষের মতোই যেন মীর জাফর, জগৎ শেঠদের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ঘসেটি বেগম। ইংরেজদের সব মিলিয়ে ছিল ৯৫০ গোরা আর ২১০০ সেপাই। সঙ্গে মাত্র আটটি কামান আর দুটি বড় তোপ। অন্যদিকে সিরাজের ছিল জঙ্গি আর ঘোড়সওয়ার মিলে ৫০ হাজার সৈন্য এবং ৫৩টি বড় কামান। কিন্তু জয় হলো ঘসেটি গংয়েরই। ২৫ বছর বয়সে মাত্র ১৪ মাস নবাব ছিলেন সিরাজ। তারপর ঘসেটির ক্রোধ আর হিংসার দাবানলে পুড়েছেন তিনি।
তাই ঘসেটি বেগম আজ আর শুধু ব্যক্তিমাত্র নন। তার এ নাম আজ বিশেষ্য থেকে হয়েছে বিশেষণ। পরিণতি পেয়েছে এক ব্যক্তিক খল-মিথে। যুদ্ধ শেষে তার সাঙ্গাত মীর জাফর নবাব হয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেই কি (!), কুষ্ঠরোগে ১৭৬৫ সালে মারা যান তিনি। নবাবির লোভে মত্ত মীরন, সিরাজের বংশের একটি ছেলেকেও যে জ্যান্ত ছাড়েনি, তার মৃত্যু বজ্রাঘাতে। কী দুঃখে কে জানে রবার্ট ক্লাইভ মরেছিলেন নিজের গলায় নিজেই ক্ষুর চালিয়ে। আর ঘসেটি বেগম? একদার দোসর মীর জাফরের ছেলে মীরনের কূটকৌশলে করুণ এক সলিল সমাধি হয়েছিল তার ঢাকার অদূরে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা আর ধলেশ্বরীর ত্রিমোহনায়।

সূত্রঃ কালের কন্ঠ

নবাব আলিবর্দী খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা ঘসেটি বেগম। আলিবর্দীর বড়ভাই হাজী আহমদের বড় ছেলে এবং ঢাকার শাসনকর্তা নওয়াজিস মোহাম্মদ শাহমৎজঙ্গের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। ঘসেটি বেগম সে কারণে ছোট বোন এবং সিরাজউদ্দৌলার মা আমিনা বেগমের দ্বিতীয় পুত্র একরামুদ্দৌলাকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। হয়তো গোপন ইচ্ছা ছিল, একদিন এই পোষ্যপুত্র নবাব হবে এবং তিনি নবাবের মাতা হিসেবে রাজকার্য পরিচালনা করবেন। কিন্তু যুবক বয়সেই একরামুদ্দৌলা বসন্ত রোগে মারা যায়। ঘষেটি বেগমের স্বামী নওয়াজিস মোহাম্মদ ছিলেন ভগ্নস্বাস্থ্য ও দুর্বল চিত্ত ব্যক্তি। তার শাসনকার্য পরিচালনা করতেন সেনাপতি হোসেন কুলী খাঁ। হোসেন কুলী খাঁর সঙ্গে ঘষেটি বেগমের অবৈধ সম্পর্ক ছিল বলে অনুমান করা হয়। আলিবর্দীর ইঙ্গিতে হোসেন কুলী খাঁকে হত্যা করেন সিরাজউদ্দৌলা। এ কারণে ঘষেটি বেগম সিরাজউদ্দৌলার প্রতি বিরূপ হন। ঘসেটি বেগম বাস করতেন মুর্শিদাবাদে সুরম্য মতিঝিল প্রাসাদে। বিক্রমপুরের আধিবাসী রাজা রাজবল্লভ ঢাকায় নওয়াজেস মোহাম্মদের দেওয়ান ছিলেন। রাজা রাজবল্লভের সহায়তায় ঘসেটি সিরাজদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নবাব যথাসময়ে এই ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে মতিঝিল প্রাসাদ থেকে ঘসেটীকে উৎখাত করে রাজ প্রাসাদে বন্দী করে রাখেন এবং তার যাবতীয় সোনাদানা বাজেয়াপ্ত করেন। পলাশী যুদ্ধের পর ইংরেজরা ঘষেটী বেগমকে ঢাকায় অন্তরীণ রাখে এবং মীরনের চক্রান্তে ঘষেটীকে মাঝনদীতে ফেলে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।

গ্রন্থনা : তাহ্মীদুল ইসলাম

বাংলা সাহিত্যে খল চরিত্র

সাহিত্যের আদি কবিরা খল চরিত্রের রূপায়ণ করেছেন। ইলিয়ড-ওডিসি, মহাভারত-রামায়ণ মহাকাব্যে খল চরিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। গ্রিক মিথে রয়েছে দেব-দেবীর বিচিত্র খলামির বিবরণ। মহাভারতের শকুনি, রামায়ণের রাবণ বিখ্যাত খল চরিত্র। জন মিল্টনের প্যারাডাইস লস্টের শয়তান চরিত্রটি শয়তানের শয়তান, বেউলফের গ্র্যান্ডেলের মা প্রকৃত খল। রবীন্দ্রনাথ খল চরিত্র হিসেবে শেক্সপিয়রের ফলস্টাফের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, কল্পনার রসে জারিত হয়ে চরিত্রগুলো সৃষ্টি হয়েছে বলে খল হয়েও আমাদের মনে সেগুলো দাগ কাটে। ‘ওথেলো’র ইয়াগো মতলববাজ, ধূর্ত চক্রান্তকারী। হ্যামলেটের চাচা ক্লডিয়াস খলতার পরিচয় দিয়েছে দুষ্কর্ম করে। সে হত্যা করে নিজ ভ্রাতা তথা হ্যামলেটের বাবাকে, বিয়ে করে রানি গারট্রুডকে, যাকে হ্যামলেট মা বলে ডাকে। বাবার প্রেতাত্দা হ্যামেলেটের চাচাকে বদমাশ বলেছে, বলেছে চতুর, ব্যভিচারী, পশু, বিশ্বাসঘাতক। ‘টেম্পেস্টে’ কুচক্রী অ্যান্টোনিও প্রস্পেরোকে সরিয়ে মিলানের ডিউক হয়েছে। মার্চেন্ট অব ভেনিসের শাইলক ক্রূরতায় খলপনা করেছে। কিং লেয়ার, রিচার্ড দ্য থার্ডে খল চরিত্র আছে। জোশেফ কনরাডের উপন্যাসে, ক্রিস্টোফার মার্লোর নাটকে, হার্ডির টেসে, নবকভের ললিতায়, মেলভিনের মবিডিকে স্মরণীয় হয়ে আছে খলাঙ্কন। কিপলিংয়ের শের খানের খলত্ব ছাড়াও জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪-তে, ডিকেন্সের রচনায়, গোর্কি ও হামসুনের উপন্যাসে চরিত্রের খলতা আমাদের অতি পরিচিত। বর্তমানে বহুল পরিচিত কিশোর সাহিত্য হ্যারি পটার সিরিজের উপন্যাসগুলোয় জে কে রাউলিং খলের বহুমাত্রিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
বিশ্বসাহিত্যের খল চরিত্রগুলোর দিকে মনোযোগ দিলে লক্ষ করা যায়, এরা কেউ অপরাধী, খারাপ ব্যক্তি, সংকীর্ণচেতা, অসততায় অসামান্য এবং নায়কের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্তিশালী। সাধারণ মানুষের কাছে এরা বাজে লোক, শত্রু, হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর নীতিহীন। সাহিত্যে খল চরিত্রের রূপায়ণের সার্থকতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন : ‘বহু লোকের বহুবিধ মন্দত্বের খণ্ড খণ্ড পরিচয় সংসারে আমাদের কাছে ক্ষণে ক্ষণে এসে পড়ে; তারা আসে, তারা যায়, তারা আঘাত করে, নানা ঘটনায় চাপা প’ড়ে তারা অগোচর হতে থাকে। সাহিত্যে তারা সংহত আকারে ঐক্য লাভ করে আমাদের নিত্যমনের সামগ্রী হয়ে ওঠে, তখন তাদের আর ভুলতে পারি নে।’ (সাহিত্যের তাৎপর্য)
খল বলতে খারাপ ব্যক্তিকে আমরা বুঝে থাকি, যে অপরের মুখ ম্লান করে দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করে, সাহিত্যে নায়কের বিপরীতে যার অবস্থান। অনেক সময় সে নিজেই নায়ক হয়ে ওঠে। অসততা যার মর্মে ফল্গুস্রোতের মতো প্রবাহিত, হীনতা যার মজ্জাগত তাকে খল হিসেবে অভিহিত করা যায়। খল অন্যের ক্ষতি করে লাভবান হয় নিজে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতি-আদর্শ তার কাছে মুখ্য নয়। বরং অনৈতিক কর্মধারা তার জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদে খল চরিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় সেই সময়ের উচ্চবর্গের জনগোষ্ঠীর মধ্যে। যারা রাতে নিম্নবর্গের নারীদের সঙ্গে সহবাস করত আর দিনের আলোয় সেসব অস্পৃশ্য নারীদের ঘৃণা করত, তারাই চর্যাপদের উদ্দিষ্ট খল। মধ্যযুগের কাব্যে দেবীদের খলপনা লক্ষ করা যায়। চণ্ডী, মনসা, শীতলা দুর্গতির দ্বারা মানুষকে পরাস্ত করে আপন মাহাত্ম্য প্রকাশ করেছে। শৈব চাঁদ-সওদাগরের দুরবস্থা দেবীর কারণে। বিক্রম দেখিয়ে কার্যসিদ্ধি করেছে দেবী। ব্যাধকে বিনা কারণে চণ্ডী দয়া দেখিয়েছে আবার কলিঙ্গরাজকে তেমনি বিনা দোষে নিগ্রহ করেছে। দয়ামায়াহীন ধর্মাধর্মবিবর্জিত শক্তিকে বড় দেখানো হয়েছে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলোয়। তবে এসব কাব্যে রূপায়িত খল চরিত্রগুলো কাব্যের সুষমা সৌন্দর্য প্রকাশ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ‘সৌন্দর্য ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে বলেছেন, কবিকঙ্কণ-চণ্ডীর ভাঁড়ু দত্ত চতুর স্বার্থপর এবং গায়ে পড়ে মোড়লি করতে মজবুত লোক। তার সঙ্গ সুখকর নয়। তবু কবি মূর্তিমান করতে পেরেছেন তাকে। সে কৌতুকরস নিয়ে জেগে উঠেছে। ভাঁড়ু দত্ত প্রত্যক্ষ সংসারে এভাবে গোচর হয় না। যতটুকু আবশ্যক সুসহ করে ততটুকুই তুলে ধরেছেন কবি। প্রত্যক্ষ সংসারে ভাঁড়ু দত্ত ওইটুকুমাত্র নয়। সমগ্রভাবে গোচর হয় না বলে তাতে আমরা আনন্দ পাই। ভাঁড়ু দত্ত বাহুল্য বর্জন করে কেবল একটি সমগ্ররসে মূর্তিতে প্রকাশ পেয়েছে। সামঞ্জস্যের সুষমার মধ্যে সমস্ত চিত্র দেখায় বলে আমরা আনন্দ পাই_একে সুষমা সৌন্দর্য বলে।
ভাঁড়ু দত্ত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ‘উজ্জ্বল জীবন্ত পাষণ্ড চরিত্র’। লোভী, অত্যাচারী, স্বার্থপর, ধূর্ত আচরণ তার। মৈমনসিংহ-গীতিকায় দুশমন কাজী মলুয়াকে তার স্বামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। অর্থলোভী আত্দীয় ভাটুক ঠাকুর, অত্যাচারী কাজী ও দেওয়ান খল। নেতাই কুটনী, চিকন গোয়ালিনী অপরের লালসার বহ্নিতে ইন্ধন দিয়েছে ও পারিবারিক জীবনের সুখ, শান্তি, পবিত্রতা নষ্ট করেছে। দুষ্টক্ষতের মতো এসব চরিত্র এখনো সমাজজীবনে বিরাজ করছে। ‘মহুয়া’র হোমরা বেদে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যে ভূমিকা পালন করেছে, তা খলেরই নামান্তর।
উনিশ শতকে বাংলা কাব্যের বিকাশের ধারায় মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র বিভীষণ অন্যতম খল চরিত্র। রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’র ভূস্বামীর খলত্ব প্রমাণিত হয় যখন পৈতৃক বাস্তুভিটা ছাড়তে হয় কৃষককে। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যে জমিদার প্রতিভূ নায়েবের উসকানিতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেধেছে। কুচক্রী জমিদার ও মহাজন শ্রেণীর ইন্ধনে নমঃশূদ্র ও মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। কারাভোগ করে সোজন। প্রেমের দুলি দূরে চলে যায়।
মধুসূদন, দীনবন্ধু, মীর মশাররফ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের নাটক-প্রহসনে বিভিন্ন খল চরিত্র তাদের খলতার স্বাক্ষর রেখেছে। মাইকেল মধুসূদনের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনে প্রবীণ জমিদার ভক্তপ্রসাদের অর্থলোভ, কৃপণতা ও লাম্পট্য চিত্রিত হয়েছে। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণে’র নীলকুঠির দেওয়ান গোপীনাথ নীলকরের পক্ষে মিথ্যা মামলা করেছে গোলকচন্দ্রের বিরুদ্ধে। এ নাটকের রোগ সাহেব ও অন্য নীলকররা খল-শিরোমণি। ‘জমিদার দর্পণে’ মীর মশাররফ উচ্ছৃঙ্খল জমিদার হাওয়াদ আলীর খলামি দেখিয়েছেন। প্রজা আবু মোল্লার যুবতী স্ত্রী নুরুন্নেহারকে বলপূর্বক অপহরণ করে। অপহরণ পরবর্তী সে মৃত্যুবরণ করলে হত্যা মামলায় শেষ পর্যন্ত সাক্ষীদের বশ করে, মুক্তি পায় জমিদার। ‘বিসর্জনে’ রঘুপতির কর্মতৎপরতা খলাঙ্কনের শামিল, যদিও পরিণতিতে তার হৃদয় দ্রবীভূত। নক্ষত্ররায় রাজাকে বলেছে, ‘রঘুপতি দেয় কুমন্ত্রণা। রক্ষ মোরে তার কাছ হ’তে।’ গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকে জগৎশেঠ-ঘষেটি বেগম, মীর জাফরদের শত্রুতায় ও বিশ্বাসঘাতকতায় পরাজয় ঘটে নবাবের।
কথাসাহিত্যে খল চরিত্রের রূপায়ণ সবচেয়ে বেশি। গল্প ও উপন্যাসের কাহিনীর ঘটনা ধারায় সম্পৃক্ত এসব চরিত্র কখনো উপন্যাসের সমস্যা আবার কখনো বা বক্তব্যের সঙ্গে জড়িত হয়ে খলারু হয়ে উঠেছে। প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরে দুলাল’ রচনায় ঠকচাচা চরিত্রটি উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের খল চরিত্রের চমৎকার দৃষ্টান্ত। কূটকৌশল ও স্তোকবাক্যে মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারদর্শী জীবন্ত চরিত্র ঠকচাচা। প্রবঞ্চনাশ্রয়ী জীবন তার। তাকে বলা হয়েছে উনিশ শতকের ডামাডোলের এক কিম্ভূতকিমাকার অবস্থার নিদর্শন।
তবে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে খল চরিত্রের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। চরিত্রগুলোর মিছিল বাংলা সাহিত্যে অভিনব। এরা পাপভ্রষ্ট, নীতিভ্রষ্ট, প্রবৃত্তিতাড়িত, ঘাতক-ঘাতিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাঁর নারীরা চতুর ও কূটকৌশলী এবং দাগি। বিমলা, কতলু খাঁ (দুর্গেশনন্দিনী), মতিবিবি, কাপালিক (কপালকুণ্ডলা), পশুপতি, গিরিজায়া (মৃণালিনী), দেবেন্দ্রনাথ, হীরা (বিষবৃক্ষ), গুরগন খাঁ, ফস্টর, দলনী, শৈবলিনী (চন্দ্রশেখর), লবঙ্গ, হীরালাল (রজনী), ইন্দিরা (ইন্দিরা), হরলাল, রোহিনী (কৃষ্ণকান্তের উইল), প্রফুল্ল, হরবল্লভ (দেবী চৌধুরাণী), জয়ন্তী, শ্রী, গঙ্গারাম (সীতারাম), শান্তি (আনন্দমঠ), নির্মলকুমারী, জেবুন্নেসা, দরিয়া (রাজসিংহ) প্রভৃতি চরিত্রের খলাচার ও খলময় স্বভাব বাংলা সাহিত্যে অনন্য। তবে এদের মধ্যে খলস্বভাব ও নায়কোচিত বৈশিষ্ট্য আছে পশুপতির।
শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বিষবৃক্ষের হীরাকে বলেছেন ‘ভিলেন’। কুন্দ-নগেন্দ্র-সূর্যমুখী ত্রিভুজ পারিবারিক গণ্ডি থেকে কাহিনী ধারাকে বের করে এনেছে হীরা। ঈর্ষাদগ্ধ, অভিমানবিকৃত, বিদ্বেষক্রূর হৃদয়ের হীরা গৌণ চরিত্র নয়। দেবেন্দ্র-হীরাই উপন্যাসের সমাপ্তি টেনেছে। দুর্বিনীত খল রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের সন্দীপ। নগ্নভাবে সে নিজেকে জাহির করে, প্রবৃত্তির জয়গান করে, পৌরুষের অহঙ্কারে ছিনিয়ে নিতে চায় সব কিছু। সন্দীপের রাজনৈতিক মত্ততা লেখকের মতে তার চরিত্রেরই নগ্ন লোভাতুরতার পরিণাম। উল্লেখ্য, সন্দীপের আদর্শ নায়ক রাবণ।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘গৃহদাহে’র সুরেশকে খল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সমাজ ও ধর্মকে সে পৃথক করে দেখেছে। কিন্তু অচলার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণে সে যা করেছে, তা প্রচলিত হিন্দু সমাজবহির্ভূত। অচলাকে ভুলিয়ে এনে সুরেশ যে খলযাত্রার পথ উন্মোচন করেছে, তা অচলার জীবনের ট্র্যাজেডিকে ত্বরান্বিত করে তোলে। মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’র এজিদ রূপমোহে যে কাজগুলো করেছে, তা তাকে খলের মর্যাদা দিয়েছে। এজিদের উপায় ও কৌশলগুলো ছিল নীতি-আদর্শবহির্ভূত।
‘কল্লোলে’র কথাসাহিত্যে রূপায়িত চরিত্রে স্খলনবৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। গল্প ও উপন্যাসে খল, শঠ, শঠতানিপুণ, শয়তান চরিত্রের দেখা মেলে একাধিক। সৃষ্ট চরিত্রের শঠতার সঙ্গে তাদের ক্রূরতা, ক্রূরাচার, ক্রূরমতিত্বের পরিচয়ও পাওয়া যায়। নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের রচনায় বেশ্যা-মাতাল-গেঁজেল-জুয়াড়ি-অপরাধীর মিছিল অনর্গল। যুবনাশের ‘পটলডাঙ্গার পাঁচালী’তে কালনেমি গণেশ ডাকু নিজের স্ত্রীকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে রাজি হয়ে খলত্বের পরিচয় দিয়েছে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘আকস্মিক’ উপন্যাসে ছলনায় পারঙ্গম কুঞ্জ। অন্যদিকে পঞ্জ নানা দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত।
জগদীশ গুপ্তের সাহিত্যে বসেছে খলের হাটবাজার। তাঁর কথাসাহিত্যে ‘কোমরবাঁধা শয়তান’ মানুষের ইতরতা, নীচতা, নোংরামি প্রকাশিত হয়েছে। মূলত তিনি মানুষের স্বভাবের দৈন্য, কদর্যতা, লালসা, অমানুষিক হীনতা, লোলুপতা ও অপকৌশলের চিত্র তুলে ধরতে খল চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। লঘু-গুরু, অসাধু সিদ্ধার্থ, গতিহারা জাহ্নবী, রোমন্থন, মহিষী, রতি ও বিরতি প্রভৃতি উপন্যাসে মানুষের মনুষ্যত্বহীনতা, খলতা ও খলাচার বর্ণিত হয়েছে। এসব মানুষের নৈতিক মর্যাদাবোধ নেই। সূক্ষ্ম সুখ-দুঃখ অনুভূতি অনুপস্থিত। এরা মেরুদণ্ডহীন।
‘অসাধু সিদ্ধার্থে’র নটবর সিদ্ধার্থ নামে মৃত এক ব্যক্তির ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল অজয়া নামে একটি সুন্দরী তরুণীর হৃদয় হরণের জন্য। তাদের বিবাহের আগে নটবরের জাল সিদ্ধার্থ পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে। তার ছদ্মবেশের ব্যর্থতা প্রকৃতপক্ষে তার খলত্বের পরিণাম। ‘গতিহারা জাহ্নবী’তে ভূস্বত্বভোগী নিষ্কর্মা স্থূল প্রবৃত্তিপরায়ণ গ্রাম্য যুবক অকিঞ্চন তার নববিবাহিতা স্ত্রী কিশোরীর দৃষ্টিতে কামার্ত বহুগামিতায় উৎসাহী যুবক। অকিঞ্চনের মাতা কাত্যায়নীকে কিশোরী মনে মনে বলেছে, ‘জননী কতবার কত জলে স্নান করিলে তোমার পুত্র শুচি হইতে পারে?’ তার প্রতি এ নারীর ঘৃণা ও অরুচি চরিত্রের খলন উন্মোচনে সহায়ক হয়েছে। স্বামীর পরনারীলোলুপতাকে ক্ষমা করতে পারেনি সে। ‘রোমন্থনে’ সম্মানিত ব্রাহ্মণ হয়েছেন কুচক্রী, মিথ্যা মামলার সাক্ষী। ‘মহিষী’তে বখে যাওয়া অশোকের ইতরতা প্রকাশ পেয়েছে নিজ স্ত্রী সম্পর্কে কুৎসা রটনার মধ্য দিয়ে। কূটকৌশলী, অর্থগৃধ্নু মামলাবাজ ও সুদখোর মহাজন ব্রজকিশোরের পারিবারিক কাহিনী এটি। তার সমাজ কলুষ ও ইতরতায় পূর্ণ। দুলালের দোলায় কপটদের ভণ্ডামি ও ইতরতায় পূর্ণ পরিবেশ দেখা যায়। ‘কলঙ্কিত সম্পর্ক’ গল্পে সাতকড়ি নারী ধর্ষণের দায়ে জেল খেটে মুক্ত হয়ে পুনরায় স্ত্রীর সঙ্গে সংসার শুরু করে। ‘আদিকলার একটি’তে সুবল কাঞ্চনের শিশুকন্যাকে বিবাহ করে তার মাতাকে সম্ভোগ করার অভিপ্রায় নিয়ে। তাকে ধর্ষণও করে সে। কাঞ্চন ‘যেন স্পষ্ট দেখিতে পাইল, বহুদিনের সঞ্চিত ইচ্ছা খলতায় ছলনায় পরিপূর্ণ হইয়া শামুকের মতো ধীরে ধীরে বুকে হাঁটিয়া অগ্রসর হইয়া হঠাৎ খাড়া হইয়া উঠিয়াছে।…পাপিষ্ঠের এই লজ্জাহীন সহজ ধৃষ্টতায় তার ক্রোধের অন্ত রহিল না।’ লেখকের রচনায় দেখা যায় নর-নারী সম্পর্কের ভেতর যৌন আনুগত্য নেই। বিবাহিত সম্পর্কের শুচিতা নেই। ছেলের জন্য নির্বাচিত পাত্রীর রূপে মুগ্ধ বাবা তাকে বিয়ে করে (পৃষ্ঠে শরলেখা) আবার স্ত্রী বর্তমানে দ্বিতীয় বিবাহ, সপত্নীর সমস্যার মধ্যে পুরুষের ইতরতাকে তুলে ধরেন লেখক। ‘চন্দ্রসূর্য যতোদিন’ গল্পে শ্বশুরের সম্পত্তির লোভে দীনতারণ প্রথম স্ত্রী ক্ষণপ্রভা থাকতেও শালিকা প্রফুল্লকে বিয়ে করে। জগদীশ গুপ্তের রচনায় পরনারী সম্ভোগে খল চরিত্রগুলোর মনের কোনো নৈতিক বা রুচিগত বাধা নেই। তাদের যৌনক্ষুধার কাছে সম্পর্কজনিত বাধাও বাধা নয়। হিংস্র পাশবিক নীচতায় ভরা জগতে মানুষের ঈর্ষা ও অর্থগৃধ্নুতা সহজাতধর্ম। সম্পত্তি ও টাকার জন্য কুকর্মই এদের দ্বারা সম্ভব। পয়সায় পাপ নেই বলে বন্ধুকেও এরা হত্যা করতে পারে।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘কুয়াশা’ উপন্যাসের নায়ক প্রদ্যোত বসুর অতীত জীবন কলুষময় ও ইতরামোতে পূর্ণ। অতীতে সে ছিল জোচ্চোর ও শঠ। অনৈতিক জীবনযাপন নোংরামো ও অসুখে পরিপূর্ণ। ‘উপনায়নে’ একইভাবে তরুণ সন্ন্যাসী অমৃতানন্দের অতীত হচ্ছে দারিদ্র্য, অনৈতিক ও মনুষ্যত্বহীনতার জীবন। সে অতীতে ছিল বিনু। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও বস্তিবাসী বিনু বাবার অনাচারে জীবনের সুস্থতা থেকে বঞ্চিত হয়। জীবনানন্দ দাশের ‘মাল্যবান’ উপন্যাসের মাল্যবান-স্ত্রী উৎপলা দাগি অপ্রেমের নারী। হৃদয়হীন নির্মম ও ঘৃণ্য। মাল্যবান বলেছে, ‘কতো যে সজারুর ধ্যাষ্টামো, কাকাতুয়ার নষ্টামি, ভোঁদরের কাতরতা, বেড়ালের ভেংচি, কেউটের ছোবল আর বাঘিনীর থাবা এই নারীটির।’ স্ত্রীর খলপনার জন্য মর্মান্তিক বিরূপতার সম্পর্ক তাদের দাম্পত্যে।
তিরিশোত্তর বাংলা কথাসাহিত্যে মানিক, তারাশঙ্কর এবং অন্যদের রচনায় খলাঙ্কন গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে। ‘কল্লোল’ এবং তার পরবর্তী যুগের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা খল চরিত্র নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’র ‘রহস্যময়’ হোসেন মিয়া মাঝিদের নিস্তরঙ্গ জীবন বদলে দিয়েছে। গোপন ও দুর্জ্ঞেয় মতলব হাসিল করতে গিয়ে খলতার পরিচয় দিয়েছে সে। ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পে ক্রূরতা, নির্মমতা, নিষ্ঠুর নির্দয়তা, অকৃতজ্ঞতা, যৌনতা, প্রবৃত্তিতাড়না ও বেঁচে থাকার দুর্নিবার প্রয়াস প্রভৃতির সমন্বয়ে ডাকাত ও ভিখারি ভিখুকে অনন্য খলের নিদর্শন হিসেবে সৃষ্টি করেছেন মানিক। ডাকাতি করতে গিয়ে আহত হয়ে বন্ধু পেহ্লাদ বাগদির গৃহে আশ্রয় না পেয়ে তাকেই খুন করার হুমকি দেওয়া, আশ্রয়দাতা পেহ্লাদের স্ত্রীকে লাঞ্ছনার পর বন্ধু কর্তৃক প্রহৃত হয়ে তার গৃহেই অগি্নসংযোগ, ভিক্ষাবৃত্তি জীবনে পাঁচীকে পাওয়ার জন্য বসিরকে হত্যা প্রভৃতি ঘটনা তার চরিত্রে পাঁচীর প্রতি মমত্ববোধকে অতিক্রম করে যায়। সমাজের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবৃত্তিতাড়িত ভিখু বলিষ্ঠ বীভৎস আদিম মানবের জিঘাংসা, রিরংসা ও ভোগবাদিতায় শিল্পিত। লেখকের ‘জীবনের জটিলতা’ উপন্যাসে বিমল নিম্ন-মধ্যবিত্ত। দাম্পত্য জীবনে যৌনঈর্ষাকাতর। চক্রান্তপরায়ণ, নীরব পীড়নকারী। স্ত্রীকে স্নায়বিক অত্যাচার চালায়, আত্দহত্যায় প্ররোচিত করে। স্ত্রী তার কারণে আত্দহত্যা করলে স্ত্রীর প্রেমিকের বোনকে বিয়ে করতে চায় সে। নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য তার এ আকাঙ্ক্ষা। ‘অহিংসা’র আশ্রম পরিচালক বিপিন ভণ্ড। আশ্রম হচ্ছে তার ধন উপার্জনের উপায় এবং আশ্রমের কপট সাধু সদানন্দ ধর্মের মুখোশ আবৃত এক যৌনবিকারগ্রস্ত মানুষ। ‘দর্পণে’র মিল মালিক লোকনাথ ধূর্ত, ঠগ, ফন্দিবাজ ও কূটকৌশলী। নানা কৌশলে শ্রমিকদের শোষণ করে সে। নিকটাত্দীয়ের সঙ্গে প্রতারণা করে। পারিবারিক জীবন তার কলুষ, অনৈতিকতা ও বিকারে পূর্ণ। লাম্পট্য তাদের পরিবারের প্রধান ধর্ম। ‘জীয়ন্তে’ নারীলিপ্সু চরিত্রহীন জমিদার পুত্র খলামি করেছে। প্রজাদের হাতে লাঞ্ছিত হয়ে কাপুরুষ জমিদার পুত্র পালিয়ে গেছে কলকাতায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আরণ্যকে’ দেবী সিং, ছটু সিং, রাসবিহারী সিং, নন্দলাল ওঝার মতো স্বার্থপর ও প্রতিপত্তিশালী অত্যাচারী মহাজন চরিত্র অঙ্কন করেছেন। যারা জমি বিলি থেকে মুনাফা করতে চায়।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণদেবতা-পঞ্চগ্রাম, নীলকণ্ঠ, প্রেম ও প্রয়োজন, কালিন্দী প্রভৃতি উপন্যাসে খলদের সমাবেশ লক্ষণীয়। ‘গণদেবতা-পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসের খল শিরোমণি শ্রীহরিপাল। সে ‘ইতর, লম্পট, প্রভুত্বগর্বোদ্ধত’। এ উপন্যাসে সমাজপতিদের ক্রূর অভিসন্ধিপরায়ণতা, ষড়যন্ত্র, কুটিলতায় অপর ব্যক্তিজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। নীলকণ্ঠে মহাজন চরিত্রটি ক্রূর, অভিসন্ধিপরায়ণ, অসৎ প্রতারক, লোভী। প্রেম ও প্রয়োজনে জমিদার লোভী, দাম্ভিক, ক্রূরতা ও বহুনারীসম্ভোগে পঙ্কিল। কালিন্দীর নব্যবণিক বিমলবাবু কূটকৌশলী, শঠতা ও অর্থের জোরে চরের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
বনফুলের ‘বৈতরণী তীরে’ উপন্যাসে ধনী বন্ধু দরিদ্র স্বামীর রূপসী স্ত্রীকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে স্বামী ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যদিকে দাগি বিবাহিত নারী স্বামীকে ভালোবাসতে পারে না স্বামীর ভালোমানুষী স্বভাবের জন্য। সে ভালোবাসতে চায় শক্তিমান নিষ্ঠুর পুরুষকে। নিষ্ঠুরতা ও শক্তিকেই সে গণ্য করে পৌরুষরূপে। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘সত্যাসত্যে’র দে সরকার সন্দীপের মতোই নর-নারী সম্পর্ক বিষয়ে নায়িকা উজ্জয়িনীকে আন্দোলিত করতে চেয়েছে। বাদল তার বন্ধু হলেও তাকে শত্রু ভেবেছে। কমলকুমার মজুমদারের অন্তর্জলীযাত্রী মুমূর্ষু সীতারাম চট্টোপাধ্যায় যশোবতীর চরিত্রে সন্দেহ করে বলেছে, ‘হারামজাদী নষ্ট খল খচ্চর মাগী।’ এখানে ‘খল’ শব্দটির প্রয়োগ লক্ষণীয়। সমরেশ বসুর উপন্যাসে বিদ্বেষপরায়ণ, হিংস্র, নির্বেদজর্জর, বিচ্ছিন্ন ও আত্দগ্লানিময় চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। ‘স্বীকারোক্তি’র অনামা নায়কের হননের ইচ্ছা মানুষ সম্বন্ধে অবিশ্বাস, ঘৃণা বিবমিষা জন্ম দিয়েছিল। ‘প্রজাপতি’তে সুখচাঁদ বা সুখেন গুণ্ডা মূল চরিত্র। ‘পাতকে’র অনামা নায়ক মূল্যবোধের বিপর্যয়ে নিজের মাকে খুন করে। ‘বিশ্বাস’ উপন্যাসে লিপির মা ছুঁড়ি সেজে থাকে। কারণ অন্য লোকের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক। লিপির অবৈধ গর্ভ সঞ্চার ও গর্ভপাত এবং নীরেনকে ধোঁকা দিয়ে অন্যের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া খলাচার। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সম্রাট ও শ্রেষ্ঠী’তে আছে খল জমিদার কুমার বিশ্বনাথ। ক্রোধ, প্রতিহিংসা, উগ্রতা, অমিতাচারী ও সম্ভোগমত্ত বেহিসেবী সে। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘দ্বীপপুঞ্জে’র ধনী নবদ্বীপ সার পুত্র মুরলী সুদর্শন, নিষ্কর্মা এবং লম্পট। কৌশল কিংবা বলপ্রয়োগে নারীদেহ সম্ভোগই তার কাজ। গোপাল হালদারের ‘ভাঙন’ উপন্যাসে নৃপেন্দ্র অকর্মণ্য, আয়েশি, স্বার্থপর, সংকীর্ণ ও দুশ্চরিত্র। স্ত্রীর বর্তমানে একটি খ্রিস্টান ধাত্রী মেয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলে সে। নীতিহীনতাই তার আদর্শ।
বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে যে খলমতি ও খলময় চরিত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার বাস্তব প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আলোকপাত পাওয়া যায় বোধিসত্ত্ব মৈত্রেয়র ‘মান্ধাতার মুখ’ উপন্যাসে। উপন্যাসের একটি চরিত্র ঋদ্ধিনাথ শর্মা বলেছে : ‘ক্যারেক্টার বলতে তো স্রেফ ভণ্ডামি, চালাকি আর ভাঁওতাবাজি। সে কাজে যার যতো বেশি নাম সে ততো বড়ো ভণ্ড-ধূর্ত-ভাঁওতাবাজ। ইংরেজ শাসন আর ইংরেজি শিক্ষা এ দেশের মান্ধাতাকে প্যান্ট-সুট-বুট পরিয়ে আরও চালাক, আরও ভণ্ড, আরও বেশি ভাঁওতাবাজ করে ছেড়েছে। দেশের ছোটবড় সবার এখানকার ভাবনা কি করে ধরে মেরে শুষে খাব ও কি করে মান্ধাতার মতো রাজতি্ব করব।’ বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে এ ধরনের বাস্তবতা লক্ষ করা যায়। তাঁর উপন্যাসে নগরজীবনের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনের রূপে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের বহুচারিতা, ছেনালিপনা, প্রগলভতা চিত্রিত হয়েছে। ‘অসূর্যস্পৃশ্যা’র দাগি নারী ভানুমতী সেন। অর্থের জন্য অপরিসীম অতৃপ্তিগ্রস্ত, জমাট জমকালো জীবনলোলুপ। যেকোনোভাবে অর্থলাভ করা, ইচ্ছেমতো খরচ করা, শরীরকে সুখ দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী সে। ব্যারিস্টার স্বামী পেশাগত জীবনে ব্যর্থ হলে তার সানি্নধ্য সে অসহ্য মনে করে। লেখকের অন্যান্য উপন্যাসেও অর্থগৃধ্নুতা, বিলাস, বিকার ও ছেনালিপনা দেখা যায়। ‘পরিক্রমা’য় বিজন ঘোষ অমার্জিত ও দুশ্চরিত্র। একঘেয়ে তাদের দাম্পত্য জীবন। সংকীর্ণ, পরশ্রীকাতর, কুৎসাপ্রবণ ও স্থূল তার মানসিকতা। ধনের প্রদর্শন, পরনিন্দা, পরছিদ্রান্ব্বেষণ এই জীবনের আনন্দ, ইতরতা ও নোংরামিতে পূর্ণ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ উপন্যাসে রাইমোহন ধনী বাবুদের মোসাহেব। গান বাঁধতে জানে, সুরও দেয়; সংস্কৃতিমনা। সে বাইজি হীরা বুলবুলকে ভালোবাসে। জমিদার শ্রেণী প্রজা-পীড়ন করত তার নিদর্শন ত্রিলোচন দাসের নিপীড়ন। কলহ, ঈর্ষা, লোভ, লালসা, চতুরতা, প্রতারণা আর ব্যভিচার মিছিল করেছে এ উপন্যাসের মধ্যে। শংকর ওরফে মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের সীমাবদ্ধ (চলচ্চিত্র সত্যজিৎ রায়) উপন্যাসে শ্যামলেন্দু উচ্চাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে খলামিতে লিপ্ত হয়। ইংরেজির অধ্যাপক থেকে কম্পানির ডিরেক্টর পদে আসীন হয়েছে নীতি বিসর্জন দিয়ে দিয়ে। দেবেশ রায়ের ‘সময় অসময়ের বৃত্তান্তে’ পুলিশ খলের ভূমিকায় অবতীর্ণ। পুলিশ নারী ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হয়। আবুল বাশারের ‘ফুলবউ’ উপন্যাসে মিল্লাতের বাবার বিধবা চতুর্থ স্ত্রী রাজিয়াকে ধর্ষণ করে মিল্লাতের বন্ধু মবিন।
বাংলাদেশের উপন্যাসে বিখ্যাত সব খল চরিত্র সাহিত্যের খলযাত্রায় শামিল হয়েছে। লাল সালুর মজিদ, চাঁদের অমাবস্যার কাদের, শহীদুল্লা কায়সারের সংশপ্তকের রমজান ও সারেং বৌয়ের লুন্দর শেখ, সূর্যদীঘল বাড়ীর গদু প্রধান, সালাম সালেহ উদ্দীনের নগরবালার আশরাফ উল্লেখযোগ্য। শওকত ওসমান, সৈয়দ শামসুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, শওকত আলী, সেলিনা হোসেন প্রমুখের রচনায় একাধিক খল চরিত্র বাংলা সাহিত্যের সরণি প্রদিক্ষণ করেছে। খলের রাজত্ব দেখা যাবে মুক্তিযুদ্ধের একাধিক উপন্যাসে। উপন্যাসে রাজাকার চরিত্র রূপায়ণে লেখকরা তাদের খল সম্রাট করে চিত্রিত করেছেন।
মূলত সাহিত্যে খল চরিত্রের স্বরূপ ও ক্রিয়া বর্ণনা করেছেন অনেক লেখক। প্রাচীন-মধ্যযুগের সাহিত্যের খল আধুনিক সাহিত্যে ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। তবে বাংলা সাহিত্যের খলের ক্ষেত্রে দেখা যায় তরুণ, বৃদ্ধ ও মধ্যবয়সী প্রত্যেকেই ধুরন্ধর, অসৎ, নিষ্ঠুর, দুশ্চরিত্র, মেরুদণ্ডহীন। দুর্বল ও অভিসন্ধিপরায়ণ তারা। উচ্চবর্গ-নিম্নবর্গ নির্বিশেষ তাদের খলযাত্রা একই গন্তব্যে ধাবমান।

ভাঁড়ু দত্ত

মঙ্গলকাব্যগুলো বাংলার ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালের ভাষ্য। ওই সময়টায় বাংলার রাষ্ট্র-সমাজ নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটা জটিলতার ঘূর্ণাবর্তে উপনীত। এ জটিলতার প্রভাব সমাজ-সংস্কৃতির ওপর তো বটেই, মানুষের ওপরও বর্তেছে। কাজেই সে সময়কার সাহিত্যে বর্ণিত বিভিন্ন চরিত্রের পশ্চাতে সমকালীন জীবনের একটা সংলগ্নতাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না, এমনকি সে চরিত্র যদি পৌরাণিক বা ধর্মাশ্রিতও হয় তবুও।
ভারতবর্ষের অন্যান্য অংশের তুলনায় এর পূর্ব দিককার বাংলা অঞ্চল অপেক্ষাকৃত নতুন হলেও এর রাজনৈতিক-সামাজিক গুরুত্ব একপর্যায়ে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিনিধিত্বমূলক হয়ে দেখা দেয়। দুজন প্রধান ধর্মপ্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ এবং জৈন মহাবীর বাংলায় ধর্ম প্রচারের জন্য আসেন। মৌর্যযুগের দীর্ঘ দুর্ভিক্ষ এবং মগধে দক্ষিণী ও তিব্বতি আগ্রাসনের পরিণামে মগধ থেকে বাংলা অভিমুখী জন-অভিপ্রয়াণের (সধংং-সরমৎধঃরড়হ) বিষয়টিও এখানে স্মর্তব্য। গুপ্তযুগেও বাংলার ঊর্ধ্বাঞ্চল মগধে : গুপ্ত-সম্রাটদের আকর্ষণের উপলক্ষ ছিল। শশাঙ্কের গৌড়তন্ত্রের প্রভাবে সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলে বিস্তার ঘটে শৈবতন্ত্রের। এদিকে দক্ষিণ ভারতের সেনারাও একসময় এসে হাজির হয় প্রথমত রাঢ় অঞ্চলে এবং ক্রমশ পুণ্ড্রান্তরে। পালরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়রাও তাঁদের শাসনামলে মর্যাদাপূর্ণ অংশীদারির মালিক। পরবর্তী সময়ে সেন আমল থেকে তুর্কি বিজয়কাল পর্যন্ত বাংলায় দেব-খৰ-বর্মণ-চন্দ্র প্রভৃতি রাজবংশ কোনো না কোনো দিকে প্রতিপত্তিশালী। সুলতানি আমলে বিদেশি সংস্কৃতি ও মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলায়। দিলি্লতে মোগলদের শক্তিশালী অবস্থানের সুযোগে আফগানরা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে বাংলার দিকে। রাজনৈতিকভাবে বাংলা অঞ্চলে বিকাশ ঘটে বৈচিত্র্যের।
পেশাগত বিচারেও দেখা যাবে, কয়েক শ বছরের ব্যবধানে বাংলার সমাজজীবন বিচিত্র পদ-অভিধায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উচ্চতর আর্য শেণীগুলো ছাড়াও নানা প্রশাসনিক প্রয়োজনে এবং ভূমিকেন্দ্রিকতার কারণে মানুষ বৃত হয়েছে নতুন নতুন পরিচয়ে। মধ্যযুগের বাংলায় তথা সুলতানি মোগল আমলে কমপক্ষে ছত্রিশ রকমের পেশাধারী মানুষের হদিস পাওয়া যাবে। এ পেশাবৈচিত্র্য মানুষ মানুষে প্রভেদ গড়েছে। মাথাপিছু পুঁজির অধিকারিত্ব সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক বৈচিত্র্য ও সম্পর্ক জটিলতার হেতু। সব মিলিয়ে একটা জটিল মানবিক সংস্কৃতিও মধ্যযুগের বাংলায় লক্ষণীয় হয়ে উঠেছিল।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের ভাঁড়ু দত্ত চরিত্রটি মধ্যযুগের বাংলার বহুস্তরা সামাজিক জীবনের প্রতিনিধি। চণ্ডীমঙ্গলের অনেক কবির কাব্যেই ভাঁড়ু একটি প্রাণবন্ত চরিত্র, বিশেষ করে দ্বিজ মাধব এবং মুকুন্দরামের কাব্যে সে শিখরস্পর্শী। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁকে দিয়েছেন এমন অবয়ব। চণ্ডীমঙ্গল কবির এমন একটা সময়ের রচনা যখন তিনি বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে অন্যের করুণা-দয়ায় আশ্রিত। বাকি জীবন আর তাঁর ফেরা হয়নি আপন ভূমে। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার আফগান শাসন অপসৃয়মাণ। মোগলরা একে একে ঢুকছে পূর্ব পরিবৃত্তে। বার ভূঁইয়ার দাপট ম্রিয়মাণ।
উড়িষ্যার পরাক্রমশালী কতলু খাঁ নিহত হন মানসিংহের হাতে। সেই ক্রান্তিকালে বিপর্যয় জাপটে ধরে জীবনের অভিজ্ঞতাধারী মুকুন্দরামকে। তাঁর কাব্যে প্রায় সপ্তাহ দুয়েকের গ্রাম ত্যাগের ও সুস্থিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত কবির ভেতরে উন্মীলন ঘটায় এক নব নয়নের। ফলে সামাজিক কাহিনীর একটি ক্ষুদ্র পূর্বভাষণরূপে এসে পড়ে মূল্যবান ‘গ্রন্থোৎপত্তির বিবরণ’।
সবটাই কবির জীবনের অভিজ্ঞতা। ভূমিকাংশের বিপর্যয়-বৃত্তান্ত এবং কাব্য-উপাখ্যানের প্লটটিও। কালকেতুর রাজ্য প্রতিষ্ঠার কাহিনী নিঃস্ব মানুষের স্বপ্ন-সংবচন এবং এর মাঝখানে ভাঁড়ু দত্ত মানবমনের স্বপ্ন-প্রসন্নতা ও আরাম ধ্বংসকারী এক চিরন্তন দুঃস্বপ্নের প্রতিরূপ। সাড়ে চার শ বছর আগেকার এ লোকটিকে যেন গতকাল, গত বছর, গত দশকে বা বিগত ইতিহাসের নানা বিন্দুতে দেখতে পাওয়া গেছে। যেন বিষাক্ত তীরের মাথাকে মধুমণ্ডিত করে এখনই ছুড়ে দেবে সে।
ভাঁড়ু শব্দটি মূলত ‘ভণ্ড’_এই প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষাজাত। সে ভাঁড়ুতে পরিণত হয়ে বরং আরো বিচিত্র, আরো দুর্জ্ঞেয়। শব্দটিকে চমৎকার বিশেষ্য বানিয়ে দত্ত পদবিযুক্ত কায়স্থের পরিচিতি এনে যেন অধিকতর সমাজকেন্দ্রিক করে তোলা গেল। মুকুন্দরাম এখন তাঁর চণ্ডীমঙ্গল লিখছেন ১৫৯৬-১৬০০_এর মধ্যে তখন তো ভাঁড়ুরা বটেই, তারও অনেককাল আগে থেকে তারা বাংলার সমাজে-পরিবারে পূর্ণাঙ্গ অবয়বে প্রকাশমান।
প্রতারণা, চক্রান্ত, নির্যাতন, ষড়যন্ত্র কেবল আজকের দিনের ঘটনা নয়। সন্ত্রাস, রাহাজানি, মাস্তানিও তেমনি উত্তরাধিকারের ফল। কালকেতু চেয়েছে একটি সুবিন্যস্ত শান্তিকামী অসাম্প্রদায়িক জনবসতির প্রতিষ্ঠা; কিন্তু মানুষের এসব মহৎ স্বপ্ন যেন কোনোকালেই পূরণ হওয়ার নয়। শ্রমবিমুখ, পরস্ব-অপহরণকারী, বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির কুচক্রের কাছে পরাজিত হয় সুস্থ-জীবনের অভীপ্সা। ভাঁডু দত্তেরও প্রায় সাত-আট শ বছর আগে চর্যাপদের কবি সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব ও ভাগ্যবিড়ম্বিত হওয়ার কথা পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই দুর্বলের নিগ্রহ চিরকালীন বাঙালি-জীবনের প্রধান কাহিনী। সে জন্যই ভাঁড়ুকে এমন হিরণ্যপ্রভা দেওয়ার আয়োজন দেখি কবির।
মনে হচ্ছে, যেন জটিল জীবনের ভেতর থেকে এক শক্তিশালী প্রেক্ষণযন্ত্র দিয়ে মুকুন্দরাম বের করে নিয়ে এসেছেন ভাঁড়ুকে।
কালকেতুর প্রতিষ্ঠিত নগর যে কেবল ভালো মানুষের সমবায়ে একটি আদর্শ উপনিবেশ হয়ে উঠবে, তা কিন্তু নয়। সে না চাইলেও মন্দ মানুষ ঢুকে পড়ে সেখানে। ফলে দ্বন্দ্ব হয়, জটিলতা বাড়ে, জীবনের বিরুদ্ধে স্রোতগুলো স্পষ্ট হয়। যদিও কবির বিবরণ দেখে মনে হতে পারে, ভাঁড়ু দত্ত একা, একাকী, সমাজবিরোধী মধ্যস্বত্বভোগী এক ব্যক্তি। কিন্তু তার পেছনে একটি চক্র হয়তো সক্রিয়। হাটুরেদের মধ্যে ভাঁড়ুর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ এবং দম্ভোক্তি (আমি মহামণ্ডল আমার আগে তোলা) প্রবল সমাজবিরোধীদের কার্যকলাপ। দেশ বাইরের মানুষের দখলে, স্বদেশিদের বেদনা অন্তহীন। ফুল্লরার শ্রমের পসরা রোদে-বৃষ্টিতে কেবলই দীর্ঘশ্বাস ছড়ায় অথচ আপন মানুষদেরই অচেনা ঠেকে। সব চাপের শিকার হয়ে পড়ে শ্রমজীবী মাটিসংলগ্ন জনমণ্ডলী। এমন নগর কালকেতুর প্রত্যাশা ছিল না, ছিল না কবিরও।
পরশ্রীকাতরতার শ্রেষ্ঠ মধ্যযুগীয় দৃষ্টান্ত ভাঁড়ু দত্ত। সমগোত্রীয় মানুষের উত্থানে সে ঈর্ষাকাতর। অন্যের আনন্দ, অন্যের উন্নতি তাকে জ্বালিয়ে মারে। নিম্নস্থ ব্যাধের রাজ্য হওয়াটা তো অনেক বড় সর্বনাশ (ভাঁড়ুর চোখে) কাজেই রাজতোষণের মায়াময় আয়োজন ভাঁড়ুর। রাজা দাক্ষিণ্য, দান, পৃষ্ঠপোষণায় নিজের বৈষয়িক সম্ভাবনা ফাঁপাতে থাকে ভাঁড়ু। উৎপাদন থেকে শত হস্ত দূরে থাকা ভাঁড়ুর সব ষড়যন্ত্র উৎপাদনাশ্রিত মানুষের বিরুদ্ধে। এরাই পরে আরো ভীষণ ও বিভীষণ হয়ে ওঠে।
মুকুন্দরামের কাব্যের শেষ দিকে ভাঁড়ুর পরিণামভোগ ও শায়েস্তার ব্যবস্থায় এটা মনে জাগা স্বাভাবিক যে ভাঁড়ুদের দৌরাত্দ্যেরও শেষ আছে। ভাঁড়ুকেন্দ্রিক দুঃস্বপ্নের অন্তিমে খানিকটা আরাম খোঁজা যায়_’ভাঁড়ুর ভিজায় মাথা দিয়া ঘোড়ার মুত’_এ-ও যে কাজ হয়নি তার প্রমাণ পরবর্তীকালের ভাঁড়ুর নব নব অবতারসমূহের ক্রমাবির্ভাবে। অনন্তর মধ্যযুগের বহু সাহিত্যে আমরা তাদের নানা রূপে নানা মূলে শনাক্ত করি, যাদের বারবার উত্থান ঠেকানো যায় না কোনোভাবেই। ইয়াকুব, রমজান, গদু প্রধান, লুন্দর শেখ, মজিদ, কাদের প্রভৃতি তাদের নতুন নাম বিশেষণ। যে সামাজিক অসম্পূর্ণতা-বিকৃতি, বিকাশহীনতা আবদ্ধতার ফলে ডিফর্মড চাইল্ডের মতো ভাঁড়ুদের জন্ম, সে সমাজটাকে হয়তো আমরা পাঁচ শতাব্দী পেছনে রেখে এসেছি; কিন্তু তার দীর্ঘ প্রলম্বিত ছায়ার নিচে আজও আমাদের দণ্ডায়মানতা।

মনসামঙ্গল

কবি বিজয়গুপ্তের মনসা মঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। মনসা সাপের দেবী। লৌকিক ভয়-ভীতি থেকেই তার আবির্ভাব। তবে বাংলার সব স্থানে মনসার প্রভাব প্রচলিত আছে। মনসা শিবের মানস কন্যা। পদ্মাবনে শিবের মনে মনসার জন্ম। মনসামঙ্গল কাব্যেই দেবীর যথার্থ স্বরূপ ফুটে উঠেছে। এ কাব্যে তার উগ্রমূর্তি দেখা যায়। মনসার জন্মের পরই সে ষোড়শী কন্যা। বিমাতা চণ্ডীর সঙ্গে তার কলহ বাধে, ফলে তার একটি চোখ কানা হয়ে যায়। মর্ত্যে পূজা প্রতিষ্ঠার জন্য সে নিম্নবর্ণের কাছ থেকে বলপূর্বক পূজা আদায় করেন। তখন উচ্চবর্ণের স্ত্রী দেতার পূজা প্রচলিত ছিল না। আর উচ্চ শ্রেণীর প্রতিনিধি বণিক চাঁদ সদাগর ধর্মমতে_ চাঁদসদাগর মনসার পূজা করলেই বণিক সমাজে তার পূজা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বণিক সদাগর জিন প্রতিজ্ঞায় অটল। তিনি দেবীর আক্রোশ উপেক্ষা করে ও শিবের পূজা করতে থাকেন এবং মনসাকে ‘কালি’ বলে গালি দেন। মনসার ক্রোধে চাঁদ সদাগরের ছয় পুত্র মারা যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়। ইতোমধ্যে তার আর এক পুত্র জন্ম নেয়। চাঁদ সদাগর তাকে সুলক্ষণা কন্যা বেহুলার সঙ্গে বিয়ে দেন। পাছে মনসা ক্ষতি করে এ জন্য তিনি লোহার বাসর ঘর নির্মাণ করেন। কিন্তু তার এক সূক্ষ্ম ছিদ্র ছিল মনসার জানা। বাসরে দেবী অনুচর কালনাগের দংশনে লখিন্দরের মৃত্যু হয়। চারদিকে হাহাকার পড়ে গেল মা সনকা পুত্রশোকে পাগল। এদিকে লখিন্দরের মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হলো। তখন সতীশিরোমণি বেহুলা শবের পাশে বেলায় স্থান করে নেন। এটি চল ছিল সে স্বর্গে গিয়ে স্বামীর জীবন ফিরিয়ে আনবে। পথে নানা বিপদ ও দেবীর ক্রোধ উপেক্ষা করে বেহুলা অসাধারণ সতীধর্মের জোরে স্বর্গে পৌঁছায়। সে নৃত্যগীতে দেবতাদের তুষ্ট করে স্বামীর জীবনভিক্ষা চায়। শিবের নির্দেশে অনিচ্ছার সঙ্গে মনসা লখিন্দরের জীবন ফিরিয়ে দেয়। তবে সেও মনসাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেয় সে যেন চাঁদ সদাগরকে দিয়ে দেবীর পূজা করিয়ে নেয়। বেহুলা তাতেই রাজী হয়ে স্বামীকে নিয়ে ফিরে আসে। প্রথমে চাঁদ বেঁকে গেলেও পুত্রের জীবন ও বেহুলার অশ্রুকাতর মিনতির ফলে সে পূজা দিতে রাজী হব। তবে যে হাতে শিবের পূজা করেন তিনি সে হাতে নয় বাম হাতে ফুল দেন। এতেই মনসা খুশি কারণ উচ্চ সমাজে সে প্রতিষ্ঠা পায়। আসলে বেহুলা-লখিন্দর ছিল স্বর্গের দেবদেবী উর্ষা ও অনিরুদ্ধ। তারা দেবীর অভিশাপে মর্তে জন্ম নেয় এবং দেবী পূজা প্রচারে সাহায্য করেন। মঙ্গসমঙ্গলের কাব্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কেতবাদাস ক্ষেমানন্দ ও পূর্ববঙ্গের বিজয়গুপ্তের কাজ্যের সমাদর ছিল। অত্যধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে বিজয়গুপ্তের কাব্য। কাব্যের ভাষা ও চরিত্র চিত্রনে তিনি সমস্ত মাধুর্য ঢেলে দিয়েছেন। বাংলার বাইরেও মনসার কাহিনী প্রচলিত আছে তবে এগুলোর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এ কাব্যটি করুণ রসপ্রধান বিয়োগান্তক কাব্য। কাহিনী ও গল্পের সরলতা বিচার করলে সৌন্দর্য সৃষ্টিতে বিজয় গুপ্তের এই রচনা অতুলনীয়।
-আইরিন সুলতানা

হিন্দু বিবাহ আইন প্রসঙ্গে

বাংলাদেশ হিন্দু বিবাহ বৈদিক ক্রিয়াকাণ্ড দ্বারা সম্পন্ন হচ্ছে। কোনোরকম দালিলিক প্রমাণ ছাড়া এ যাবৎ ভালোই চলছিল। কিন্তু বর্তমানে যান্ত্রিক জটিলতার যুগে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তা নিরসনে দম্পতিদের ভোগান্তি হচ্ছে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন। বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণ বাধ্যতামূলক করে হিন্দু আইনের সংস্কার করা উচিত। তাহলে বিবাহের প্রমাণপত্রটি স্বামী-স্ত্রী উভয়ই দালিলিক প্রমাণ হিসেবে সর্বক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবেন। বর্তমান সময়ে অনেক ছেলেমেয়ে বিদেশে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে এসে বিয়ে করে স্বামী বা স্ত্রীকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মৌখিক হিন্দু বিবাহ প্রমাণ অসাধ্য হয়ে পড়ে। এজন্য বিবাহের এফিডেভিট দাখিল অত্যাবশ্যক। যৌতুক নিরোধ আইন, নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রতিকার পাওয়ার জন্য বিয়ের প্রমাণপত্র প্রয়োজন পড়ে। স্বামী পরিত্যক্ত রমণী ভরণ-পোষণ আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হলে বিবাহ প্রমাণের জন্য নিবন্ধনপত্র প্রয়োজন। তাছাড়া স্বামী বা স্ত্রী সরকারি কর্মচারী হলে সরকারি পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রেও বিবাহের নিবন্ধনপত্র প্রয়োজন। তাহলে অনেক জটিলতার অবসান হবে। নাবালক সন্তানের অভিভাবক নির্ণয়, পিতৃত্ব নির্ধারণ, স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক প্রমাণ ইত্যাদি আইনি জটিলতার ক্ষেত্রে বিবাহ নিবন্ধনপত্র প্রমাণ হিসেবে খুবই সহায়ক। সাবেক কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার যুগে মৌখিক হিন্দু বিবাহ কোনো সমস্যা ছিল না। বর্তমানে সমাজ পরিবর্তন ও দ্রুত বিকাশের যুগে হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রি সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতে ইউনিয়ন বা গ্রামে পঞ্চায়েত এলাকাভিত্তিক একজন করে ম্যারেজ রেজিস্ট্রার নিয়োগ দিয়েছে। নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে তারা বিবাহ নিবন্ধন করেন। বিবাহ নিবন্ধনপত্রটি একটি আইনি দালিলিক প্রমাণ হিসেবে সর্বত্র গ্রহণযোগ্য। বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ও ডিভোর্স ব্যবস্থা ভারতে কার্যকর হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌর মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে অবৈতনিক ম্যারেজ রেজিস্ট্রার নিয়োগ করে হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সাড়ে পাঁচ হাজার হিন্দু শিক্ষিত যুবকের কর্মসংস্থান হবে। হিন্দু ধর্মীয় সমাজব্যবস্থা হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রি আইন পাস হলে যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
কালীপদ ভট্টাচার্য,সভাপতি, সংস্কৃত কলেজ,
নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ।

জব্বারের বলী খেলা

এদেশের অসংখ্য নদীবিধৌত জনপদের কূলে কূলে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির মাঝে পুষ্টি পেয়েছে কত না ইতিহাস। ১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে লড়তে দেশের তরুণদের শারীরিক ও মানসিকভাবে তৈরি করতে চট্টগ্রামের বদরপতি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল জব্বার প্রচলন করেন বলী খেলার। শুধু দেশজ ঐতিহ্যই নয়, বলী খেলা আজ ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের সোনালি পাতায়। ২০১০ সনে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে বাংলা লিংকের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হল ১০১তম বলী খেলা।

নকশি কাঁথা

কাপড়ের উপর তৈরি নকশা করা কাঁথাই নকশি কাঁথা। এক সময় গ্রামীণ বধূ, ঝিরা সাংসারিক কাজের ফাঁকে শৌখিন নকশি কাঁথা তৈরি করত। সুই-সুতা দিয়ে কাঁথা সেলাই করে সেখানে ধরে রাখত বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। মেয়ের বিয়ে হলে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর সময় মা, নানি, দাদিরা মেয়েকে উপহার দিত বাহারি রঙের নকশি কাঁথা। নতুন জামাইকে নকশি কাঁথা, বালিশ, দস্তরখানা, রুমাল উপহার দেয়া আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। এটি ছিল ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণীর মানুষের ঐতিহ্য। এমনকি বাড়িতে নতুন কোনো মেহমান এলে তার থাকার বিছানা সাজান হতো বিছানার চাদর, কাঁথা, বালিশ দিয়ে। জামালপুরের বকশীগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, যশোর, ফরিদপুর, সাতক্ষীরা অঞ্চল নকশি কাঁথা তৈরির জন্য বিখ্যাত। তবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি নকশি কাঁথা তৈরি হয় জামালপুরে। জামালপুরে নকশি কাঁথা শিল্পের নানাবিধ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

এখানকার নকশি কাঁথা গুণগতমানে উন্নত এবং দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় দেশ-বিদেশে এর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। লুপ্তপ্রায় এ শিল্পটি দুই দশক ধরে আবার আলোর মুখ দেখেছে। এনজিও প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের আড়ং বাণিজ্যিকভাবে নকশি কাঁথা উৎপাদন করছে। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে কেবল জামালপুরেই গড়ে উঠেছে_ রংধনু হস্তশিল্প, সৃজন মহিলা সংস্থা, সুপ্তি, ক্যাম্প, কারু নিলয়, জোসনা হস্তশিল্প, প্রত্যয় ক্রাফট, রওজা কারুশিল্প, কারুপল্লী, কারু নীড়, দোলন চাঁপা, ঝিনুক, সূচিকা, তরঙ্গ, দিপ্ত কুটির, বুনন, অণিকা, মিম, মামিম, শতদলসহ প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠান। ব্র্যাক গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলেছে। তাদের উৎপাদিত কাঁথা দেশীয় ক্রেতাদের কাছে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, কুমিল্লা, বরিশাল, সিলেটসহ বড় জেলা শহরগুলোতে নকশি কাঁথার বাজার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব বাজারে নকশি কাঁথা রপ্তানি হচ্ছে। দেশে নকশি কাঁথা উৎপাদনকারীদের পণ্যগুলো অধিকাংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকে। জামালপুর থেকে সরাসরি পণ্য বহন করে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার শো-রুমে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে এসএ পরিবহন ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অল্প সময়ে দ্রুত মালামাল সরবরাহ করা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত মেলায়ও এখানকার ব্যবসায়ীরা তাদের উৎপাদিত সামগ্রী বিক্রি করে থাকেন। এসব প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে। দেশে নকশি কাঁথা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে_ নকশি কাঁথা, বেড কভার, থ্রি-পিস, ওয়ালমেট, কুশন কভার, শাড়ি, পাঞ্জাবি, টি-শার্ট, ফতুয়া, স্কার্ট, লেডিস পাঞ্জাবি, ইয়ক, পার্স, বালিশের কভার, টিভি কভার, শাড়ির পাড়, ওড়না, ফ্লোর কুশন, মাথার ব্যান্ড, মানি ব্যাগ, কলমদানি, মোবাইল ব্যাগ, শিকা, শাল চাদর ইত্যাদি।

নকশি কাঁথা পণ্যের মূল্য ২৫ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকার ঊর্ধ্ব পর্যন্ত। নকশি কাঁথাশিল্পের সঙ্গে জড়িত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা স্বল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করেন। তাদের মূল সমস্যা হলো- পুঁজি সংকট, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, শ্রম মজুরি বৃদ্ধি, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নিখুঁত পণ্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়া, উপযুক্ত মূল্য না পাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্দ্য, বকেয়া টাকা পরিশোধ না করা, ডিজাইনে বৈচিত্র্যের অভাব, সরকারি আনুকূল্য না পাওয়া ইত্যাদি।

পাঁচ বছর যাবৎ দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে। এ শিল্পের সমস্যাগুলো দূর করা হলে শিল্পটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এ শিল্পের উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগে গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। তাহলে গ্রামীণ নারীদের দারিদ্র্য দূর হবে; সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। নারীর ক্ষমতায়নও বাড়বে। টিকে থাকবে নকশি কাঁথার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় ঐতিহ্য। এ শিল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যাদি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। শেখ মেহেদী হাসান