মূকাভিনয়

মূকাভিনয় শিল্পকলার একটি পুরনো শাখা হলেও বাংলাদেশে এর আধুনিক পঠন, পাঠন ও চর্চা খুব বেশি দিনের নয়। অসাধারণ এবং অপূর্ব এই শিল্প মাধ্যমটি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তেমন বিকাশ লাভ করেনি বরং অবহেলিতই হয়েছে বারংবার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মূকাভিনয় যথেষ্ট সমাদৃত হলেও এদেশে নিয়মিত চর্চা ও প্রদর্শনীর স্বল্পতার কারণে ভাষাহীন ভাষার এই শিল্প কৌশলটি মার্জিত শিল্প মাধ্যম হিসেবে স্থান করে নিতে পারেনি আমাদের সংস্কৃতির সৃজনে। মূকাভিনয় শুধু বিনোদন নয় বরং ভাষার প্রাচীর ভেঙে সকল জাতির নানাভাষী মানুষের আপনজন হয়ে ওঠার এক মুগ্ধ প্রক্রিয়া। সংলাপকে তুড়ি মেরে শরীর ও মেধার অসাধারণ সমন্বয়ের এই অভিনয় কৌশল ও বাংলাদেশে এর চর্চা নিয়ে লিখেছেন রুদ্র মাহফুজ

মূকাভিনয় শব্দটির উৎপত্তি মূক ও অভিনয় শব্দ দুটোকে কেন্দ্র করে। বাংলায় মূকাভিনয় শব্দটির ব্যবহার সাম্প্রতিককালে হলেও পূর্বে এর পরিচিতি ছিল আঙ্গিক অভিনয় শিরোনামে। অঙ্গ সম্বধীয় সঞ্চালনই কেবল নয় এখানে রয়েছে ভাব, অভিব্যক্তি, রস ও অনুভূতির এক মিশ্রণ। যে রীতি অবলম্বন করে এক বা একাধিক অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রী নির্দিষ্ট মঞ্চে দর্শকের সম্মুখে বাচিক অর্থাৎ সংলাপ ব্যতিরেকে আঙ্গিক, আহার্য ও সাত্ত্বিক বালা ব্যবহার করে মোহ সৃষ্টির মাধ্যমে গতিশীল জীবনের কোনো চিত্র শিল্পসম্মতরূপে অর্থপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন, তখনই তাকে মূকাভিনয় বলা হয়। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে মাইম, প্যান্টোমাইম কিংবা মূকাভিনয় শব্দটির সঙ্গে এদেশের সাধারণ দর্শকের পরিচিতি ছিল না বললেই চলে। তখনকার সময়ে গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন পালা-পার্বণ, ধর্মীয় উৎসব, লোকাচার, ও মেলাগুলোতে সম্পূর্ণ অপরিশীলিত অবস্থায় অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আনন্দদানের বিষয়টি প্রচলিত ছিল, যা হালের মূকাভিনয়ের পর্যায়ে না পড়লেও অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে অভিনয় করার রীতিকে প্রদেশে মাইমের অস্পষ্ট উৎস হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে না। মুক্তিযুদ্ধের পর একদল খ্যাপা তারুণ্যের হাত ধরে যে নব উদ্দীপনা নিয়ে এদেশে নাট্যচর্চা শুরু হয় তার প্রভাবে শিল্পের এই মাধ্যমটি সম্পর্কে শিল্পানুরাগীদের মাঝে আগ্রহ জাগে। তবে দু’একজন শিল্পী নিজস্ব তাগিদ থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মূকাভিনয়কে পরিচয় করলেও দলগতভাবে এর কার্যক্রম শুরু হতে লেগে যায় আরো বেশকিছু দিন। বাংলাদেশের মঞ্চে স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম হিসেবে মূকাভিনয় পরিচিতি লাভ করে ১৯৭৫ সালে আমেরিকার শিল্পী অ্যাডাম ডেরিয়াসের অভিনয়ের মাধ্যমে। এরপর অবশ্য বেশকিছু বিদেশি মূকাভিনেতা শিল্পকলা একাডেমী, ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, মহিলা সমিতি ও গাইড হাউজ মঞ্চে মূকাভিনয় প্রদর্শন করেন। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ইংল্যান্ডের নোলারে ও জার্মানির মিলান াদেক। ১৯৮৯ সালে জিল্লুর রহমান জনের পরিচালনায় ‘ঢাকা প্যান্টোমাইম’ দলটি আত্মপ্রকাশ করে। এ কথা বললে বোধকরি অত্যুক্তি হবে না যে ঢাকা প্যান্টোমাইম’ই এদেশে মূকাভিনয়কে পরিচিত করে তোলে। আত্মপ্রকাশের পর বেশ অল্প সময়ের মধ্যেই দল বেশ ঈর্ষাণীয় সাফল্য করতলগত করে। প্রথম দলগত মূকাভিনয় প্রদর্শনীই নয়, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সাথে যৌথভাবে প্রথম মূকাভিনয় উৎসবের আয়োজনও করে তারা, যাতে অন্তর্ভূক্ত ছিল মূকাভিনয় বিষয়ে একটি সেমিনারও। ১৯৯২’র মে মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত প্রথম বাংলাদেশ-ভারত মূকাভিনয় উৎসবে অংশগ্রহণ ছাড়াও ১৯৯৩’-এর জানুয়ারিতে কলকাতায় প্রথম ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভল অব নন-ভারবাল আর্টস’ শীর্ষক উৎসবে ঢাকা প্যান্টোমাইম শ্রেষ্ঠ দলগত পরিবেশনার গৌরব অর্জন করে। এছাড়া বঙ্গাব্দ ১৪০০ সালকে স্মরণীয় করে রাখার প্রত্যয়ে ভারত-বাংলাদেশ মূকাভিনয় উৎসব, যা কলকাতা ও শ্রীরামপুরে অনুষ্ঠিত হয় সেখানে অংশগ্রহণ, নৈহাটিকে ১৪০১’-এর উৎসবে অংশগ্রহণ ছাড়াও দলটি দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে পারফর্ম করার গৌরব অর্জন করে। তবে দলটির কর্ণধার জিল্লুর রহমান জনের উদ্যোগ ও পরিচালনায় শিল্পকলা একাডেমীতে ক’বার কর্মশালা হয়, যা অনেককেই ভীষণ অনুপ্রাণিত করে তোলে এই মাধ্যমটি সম্পর্কে। বাংলাদেশে মূকাভিনয় শিল্পের বিকাশ, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন যাদের হাত ধরে হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন পার্থপ্রতিম মজুমদার ও কাজী মশহুরুল হুদা। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মূকাভিনয় শিল্প বেশ কিছুদুর এগিয়ে গেলেও একপর্যায়ে তারা দু’জনই বিদেশ বিভূঁয়ে পাড়ি জমান। একদিকে অগ্রজ এই শিল্পীদ্বয়ের অনুপস্থিতি, অন্যদিকে ঢাকা প্যান্টোমাইমের স্থবিরতা, এ সবকিছু মিলিয়ে অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়ে মূকাভিনয় শিল্প। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর একাডেমিক সিলেবাসে মূকাভিনয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা পরবর্তীতে অনুসরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও সংগীত বিভাগেও। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন মাঝে মাঝে তাদের শীতল ঘুম থেকে জেগে দু’একটা কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। হালে এমনই এক কর্মশালা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন নাট্যদলের মূকাভিনেতারা তাদের সৃজন চেতনাকে বিকশিত করতে পেরেছেন। দুনিয়াজুড়ে অনেক প্রথিতযশা মূকাভিনয় শিল্পী এদেশের মাইম অনুরাগীদের অজান্তেই অনুপ্রাণিত করেছেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন চেকোে াভাকিয়ার বংশোদ্ভূত জ্যাঁ ব্যাপতিস্ত গ্যাসপার্ড ডুবরো, যিনি ফ্রান্সের মূকাভিনয় শিল্পের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৮৮৯ সালে ১৬ এপ্রিল লন্ডন শহরে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বখ্যাত নির্বাক ছবির প্রণেতা কিংবদন্তী চার্লি চ্যাপলিন। তার অভিনয়শৈলী মূকাভিনয়কে আধুনিক এক জ্যামিতিক রেখাচিত্রের সন্ধান দেয়। পৃথিবীর বিখ্যাত অনেক মূকাভিনেতা যার ছাত্র সেই এতিয়েঁ ডেক্রু ফ্রান্সে মূকাভিনয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন। প্রতিভাবান এই অভিনেতার ছাত্র মার্সেল মার্সো ১৯৪৭’-এ ইউরোপজুড়ে সাড়া জাগাতে সক্ষম হন তার বিখ্যাত চরিত্র ‘ব্রিপ’র মাধ্যমে। এছাড়া আরও রয়েছেন জ্যাঁ লুই বারো, লাডিস লাভ ফিয়ালকা, টমাস জিওস্কি, পল জে কার্টিস, মানি ইয়াকিম, স্যামুয়েল এভিটাল, মানাকো ইওনিয়ামা, থিও লেজোলাস, রলফসারে, মিলান াদেক, নোলারে, যোগেশ দত্ত, নিরঞ্জন গোস্বামী, অশোক চ্যাটার্জি প্রমুখ। বাংলাদেশের কিংবন্তি মূকাভিনেতা পার্থপ্রতিম মজুমদার এদেশে মাইমের অনুশীলন নিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার ভাবতে খুব কষ্ট হয় যে, এদেশে মূকাভিনয় চর্চা তেমন একটা বিকশিত হয় না। প্রচুর মেধাবী ও মাইম অনুরাগী নাট্যকর্মী রয়েছেন, যারা মূকাভিনয়কে জানতে ও শিখতে চান, কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার দারুণ অভাব রয়েছে এখানে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ও গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এ বিষয়ে অনেকটাই উদাসীন বলা যায়। তবে সম্প্রতি ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কিছু কিছু কাজ হচ্ছে, যা মূকাভিনয়কে আরও প্রসার করবে বলে বিশ্বাস করি। এই শিল্প মাধ্যমটিকে বিকশিত করতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।’

লাঙল

জমি চাষ করার জন্য শত শত বছর ধরে বাংলার কৃষকরা লাঙল ব্যবহার করছেন। পোড়ামাটির প্লেটে সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে বাংলায় লাঙল ব্যবহারের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। লৌহযুগে লোহার ফলার আধুনিক লাঙলের ব্যবহার শুরু হয়। এর আগে কাঠের তৈরি লাঙল ব্যবহার হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লায় একেক ধরনের লাঙল ব্যবহৃত হয়। লাঙল ও হাল চাষ নিয়ে অনেক কবিতা-গান রয়েছে। আশির দশকে পাওয়ার টিলারের আগ্রাসন শুরু হলে লাঙলের সংখ্যা কমতে থাকে। এছাড়া গরুর অগ্নিমূল্য, গো-খাদ্যের সঙ্কট,  ট্রাক্টরের আগ্রাসনের কারণে লাঙল হারিয়ে যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে লাঙলের স্থান হবে জাদুঘরে।

টুবু

আফ্রিকার টুবু উপজাতিরা শিকারের জন্যে এক ধরনের থ্রোইং নাইফ ব্যবহার করে, যা দেখতে ঠিক উড়ন্ত পাখির মতো।-রঙিন পাখি ফিজ্যান্ট এক মাস না খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারে।সাইবেরিয়ার ইয়াকুতরা বিশেষ এক ধরনের ডেজার্ট তৈরি করে থাকে, যা তাদের কাছে খুবই প্রিয়। টক দুধের সঙ্গে জামজাতীয় জল, শিকড় এবং হাড় মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই ডেজার্ট। ভীষণ শক্ত এই খাবার খাওয়ার আগে গলিয়ে নিতে হয়।

নৌকা

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদীর বুকে ঢেউ এর সঙ্গে দোল খেতে খেতে চলে অসংখ্য নৌকা। বাংলাদেশের একেক অঞ্চলে একেক ধরনের নৌকার দেখা মেলে। তাদের যেমন আলাদা গঠন তেমনি আলাদা তাদের ধারণ করার ক্ষমতাও। তথ্য ইপাত্ত থেকে ৫৭ ধরনের নৌকার সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন_চাঁদপুরের ঘাসি ও পালকি, চট্টগ্রামের সাম্পান, টেম্পো ও শুলুক, ময়মনসিংহের ময়ূরপঙ্খি ও তাবোড়ি, সিরাজগঞ্জের বেদি, রাজশাহীর বাসারি ও জোড়া নৌকা, কিশোরগঞ্জের পাতাম, খুলনার পদি, পাবনার পানসি, মালার, ডিঙি ও কোষা, বরিশালের বাজিপুরী, সিলেটের গসতি, গোপালগঞ্জের করপাই, সাভারের পালোয়াড়ি, পালটাই ও বেদে নৌকা, ফরিদপুরের বিক এবং গাইবান্ধার ফেটি ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই নৌকাগুলোর অধিকাংশই আজ বিলুপ্তির পথে।
তৈরী পদ্ধতিঃ
আদিকালে নৌকা তৈরি হতো বড় কাঠের গুঁড়ির মাঝখানটা খোদাই করে। পরে বাঁশ, বেত, চামড়া এবং কাঠের আঁটি বেঁধে নৌকা তৈরি করা হতো। তবে শেষ পর্যন্ত কাঠই ছিল নৌকা তৈরির প্রধান উপকরণ। কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরির বিষয়গুলোকে খুব ভালোভাবেই স্থান দেওয়া হয়েছে প্রদর্শনীতে। কাঠ চেরাইয়ের আঙ্গিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে একটি আস্ত কাঠের গুঁড়ি ও করাত। দেখে মনে হবে, কাঠ চেরাই করা হচ্ছে। চেরাই করা কাঠকে বলা হয় তক্তা। এই তক্তা দিয়েই বানানো হয় নৌকা। নৌকা তৈরিতে লাগে পেরেক, গজাল, তারকাঁটা ইত্যাদি। তা ছাড়া ছই বানাতে লাগে মুলিবাঁশ। গজাল মেরে নৌকার বডি যখন বানানো হয়, তখন নৌকাকে বিশেষ কায়দায় কাত করে রাখা হয়। তবে ছোট কোষা নৌকা বানানোর ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি ব্যবহার না করলেও চলে। কারণ, ছোট্ট কোষা নৌকাকে কাঠ দিয়ে ঠেস দিয়ে কাত করে তৈরির কাজ করা যায়। কিন্তু বড় নৌকা বানানোর ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির বিকল্প নেই।
১.ডিঙি
বাংলার নৌকার সবচেয়ে প্রচলিত ধরনটি হচ্ছে ডিঙি। নদীর পাড়ে কিংবা জলাশয়ে খুব কাছাকাছি থাকা লোকজন সারাক্ষণ তাদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে এটি ব্যবহার করে থাকে। একজনই এটিকে চালানোর জন্য যথেষ্ট। সাধারণত এটির দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৫০ থেকে ৭ দশমিক ৬০ মিটার হয়ে থাকে। বৈঠা দিয়ে ডিঙি বাওয়া হলেও কখনো কখনো পাল ব্যবহার করা হয়।
২.বজরা
উনিশ শতকে ভারতবর্ষে ইউরোপীয় এবং স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে বেশ জনপ্রিয় নৌযান। আরাম-আয়েশের সব সুবিধা ছিল এর ভেতর। খাবারদাবার, কাপড়চোপড় থেকে শুরু করে চাকরবাকর সবকিছুর আয়োজন থাকত বজরায়। এ নৌকার দুই-তৃতীয়াংশ জায়গাজুড়ে ছিল থাকার কক্ষ। ঘরবাড়ির মতো এসব কক্ষে থাকত জানালা। কোনো কোনো বজরায় পালও থাকত। এসব বজরা দীর্ঘযাত্রার জন্য ব্যবহৃত হতো। বজরা মূলত সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলে দেখা যেতো।  এতে যাত্রীর ধারণক্ষমতা সাত থেকে ১০ জন। আর এটির মাঝি থাকত চারজন। এর দৈর্ঘ্য ১৩ দশমিক ৭২ মিটার থেকে ১৪ দশমিক ৬৫ মিটার, প্রস্থ ২ দশমিক ২৫ থেকে ৩ দশমিক ২০ মিটার।
৩.সাম্পান

সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে বেড়ায় সাম্পান। চিটাগাং, কুতুবদিয়া এসব এলাকায় বেশ সাম্পান নৌকার দেখা মেলে। সাম্পান শব্দটি এসেছে ক্যান্টনিজ স্যাম পান থেকে, যার অর্থ তিনটি তক্তা। দক্ষিণ চীনের গুয়াংঝাউয়ের প্রাচীন নাম ক্যান্টন। সমুদ্রের ঢেউ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সাম্পানের চারদিক বেশ উঁচু হয়ে থাকে। এই নৌকাগুলোর সামনের দিকটা উঁচু আর বাঁকানো হয়, পিছনটা থাকে সোজা। প্রয়োজনে এর সঙ্গে পাল থাকে আবার কখনও থাকে না। দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ‘বৃহৎবঙ্গ’তে সাম্পান সম্পর্কে লিখেছেন, ‘দেখতে এটি হাঁসের মতো। এটি তৈরি হয়েছে চীন দেশের নৌকার আদলে।’ সাম্পানের সামনের অংশটি জোয়ারের সময় সমুদ্রের ঢেউ কেটে কেটে সামনে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। দুই ধরনের সাম্পান আছে। সমুদ্র উপকূলের আশপাশে চলার জন্য ছোট সাম্পান আর সমুদ্রে চলাচলের জন্য বড় সাম্পান। এর মাঝির সংখ্যাও কম। এক মাঝিচালিত এই নৌকাটি যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি লম্বায় হয় ৫.৪০-৬.১০ মিটার এবং চওড়া হয় ১.৪০-১.৫৫ মিটার পর্যন্ত। একসময় বড় আকারেরও সাম্পান দেখা যেতো কুতুবদিয়া অঞ্চলে যা এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই সাম্পান গুলোর দৈর্ঘ্য ১২.৮০ থেকে ১৪.৬৫ মিটার পর্যন্ত হতো এবং প্রস্থ ছিলো ৪.৬০ থেকে ৫.২০ মিটার। সাত জন করে মাঝি থাকতো আর থাকতো তিনকোণা আকারের তিনটি করে পাল। এই সাম্পানগুলো ব্যবহৃত হতো মাল পরিবহনের জন্য।
৪.গয়না

এই নৌকাটির নাম কিন্তু মজার, গয়না। দুঃখজনক হলেও সত্যি এই নৌকাটিও নাম লিখিয়েছে বিলুপ্তির খাতায়। গয়নার নৌকাটি আকৃতিতে মাঝারি ধরণের, দৈর্ঘ্যে ৭.৬০ থেকে ১২.৮০ মিটার পর্যন্ত হতো আর প্রস্থে হতো ১.৮০ থেকে ৩.০ পর্যন্ত। এদের দেখা মিলতো কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে। মূলত যাত্রী পারাপারের কাজেই এদের ব্যবহার করা হতো। একবারে প্রায় ২৫-৩৫ জন পর্যন্ত যাত্রী বহন করার ক্ষমতা ছিলো এই নৌকাটির। আবার রাজশাহী অঞ্চলে এর থেকেও বড় আকারের গয়না নৌকার দেখা মিলতো। এদের দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় ১৪.৬০-১৮.২০ মিটার। এরা আকারে যেমন বড়ো তেমনি এ নৌকায় বেশী সংখ্যক যাত্রীও উঠতে পারতো। এতে যাত্রী উঠতে পারতো প্রায় ৪০-৫০জন।
৫.বাইচ

দেশের অনেক অঞ্চলে বাইচের নৌকা ছিল এবং এখনো তার কিছু টিকে আছে। বাইচের জন্য ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের নৌকা।
ঢাকা, ময়মনসিংহে কোষা নৌকা; টাঙ্গাইল ও পাবনায় লম্বা ছিপছিপে নৌকা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেটে সারেঙ্গি নৌকা; চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও সন্দ্বীপে সাম্পান-জাতীয় নৌকা, ফরিদপুরে গয়না-জাতীয় নৌকা ব্যবহার হয়। বাইচ নৌকা সাধারণত সরু এবং লম্বায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট।
প্রতিযোগিতার সময় ৭, ২৫, ৫০ বা ১০০ জন মাঝি থাকতে পারে। মুসলিম শাসনামলে নবাব-বাদশাহরা নৌকাবাইচের আয়োজন করতেন।
নৌকার গতি অনুসারে রাখা হয় সুন্দর সুন্দর নাম_পঙ্খীরাজ, ঝড়ের পাখি, সাইমুন, তুফান মেল, অগ্রদূত, দ্বীপরাজ, সোনারতরী ইত্যাদি।
৬.পাতাম
এটি দেখা যেত সিলেট ও কিশোরগঞ্জে। মালবাহী নৌকাটির নামকরণ হয়েছে ‘পাতাম’ শব্দ থেকে। এই পাতাম একধরনের লোহার কাঁটা। এটি দিয়ে দুটি কাঠকে জোড়া লাগানো হয়ে থাকে। এজন্য একে জোড়া নৌকাও বলে। নৌকার বডির কাঠগুলো জোড়া লাগানো হতো পাতাম দিয়ে। এমন করে লাগানো হতো যেন নৌকার ভেতরে কোনো ধরনের পানি ঢুকতে না পারে। প্রয়োজনে পাতাম লাগানোর জায়গায় দুই কাঠের মাঝখানে দেওয়া হতো পাটের আঁশ। পাতাম নৌকা ছয় থেকে ৪৪ টন পর্যন্ত বহন করতে পারে। এতে মাঝি থাকে পাঁচজন। নৌকাটি লম্বায় ১০ থেকে ১৮ মিটার, প্রস্থে ২.৫ থেকে ৪ দশমিক ৩০ মিটার এবং এর গভীরতা দশমিক ৬৪ থেকে ১ দশমিক ০৫ মিটার। এর একটি পাল ও দুটি বৈঠা। নৌকাটি এখন বিলুপ্তপ্রায়।
৭.ময়ূরপঙ্খি
বজরার মতো এটিও ভারতবর্ষের নবাব ও জমিদারদের নৌযান। এটির সামনের অংশটি ময়ূরের মতো দেখতে হয় বলে এর নাম ময়ূরপঙ্খি। এ নৌকার কথা বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে বেশ পাওয়া যায়। অঞ্চলভেদে ময়ূরপঙ্খির নকশা খানিকটা পরিবর্তন দেখা যায়। ছবির এ নৌকাটি ময়মনসিংহ এলাকার। সাত থেকে দশজন যাত্রী ধারণক্ষম এ নৌকা চালাতে লাগে চারজন মাঝি। এটি দৈর্ঘ্যে ১১ দশমিক ৪০ থেকে ১৩ দশমিক ৭৫ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
৮.মাছ ধরার নৌকা
জেলেরা এ নৌকাগুলোতে ভেসে ভেসে দূর নদীর বুকে মাছ ধরে। কিন্তু এই অতি সাধারণ মাছ ধরার নৌকারও আবার রকমফের আছে। কোনোগুলো আকারে হয় ছোট আবার কোনোগুলো হয় বড়ো। যেমন বরিশাল অঞ্চলের নদীতে মাঝারি আকারের এক ধরনের মাঝ ধরার নৌকার দেখা পাওয়া যায়। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭.৩৯ থেকে ৯.১০ মিটার হয়। এতে ৩ জন মাঝি বা জেলে থাকে। আবার চাঁদপুরে আরেক ধরনের মাছ ধরার নৌকা দেখা যেতো। এগুলির দৈর্ঘ্য ছিলো ৯.১৫ থেকে ১১.৪৫ মিটার পর্যন্ত। যদিও এখন আর এই নৌকাগুলো দেখা যায় না। এতে মাঝি থাকতো ৮-১০জন করে। উপক‚লীয় চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় আকারের মাছ ধরার নৌকার দেখা মিলবে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে এগুলো মাছ ধরে। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫.২৫ থেকে ১৮.৫ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। 
৯.বালার
নদীমাতৃক আমাদের এই দেশে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মালামাল পাঠানো বা যাতায়াতের জন্য নদী একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্য সেই আগেকার সময় থেকে এখনো পর্যন্ত নৌকা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কুষ্টিয়া অঞ্চলে তেমনি এক প্রকার নৌকার দেখা মেলে। এদের নাম বালার। এগুলো আকারে অনেক বড় হয় আর প্রায় ১২-৫৬ টন পর্যন্ত মালামাল বহন করতে পারে। এরা দৈর্ঘ্যে ১২-১৮ মিটার হয়ে থাকে আর বৈঠা বায় ১০-১২ জন মাঝি এবং পাল থাকে দুটো করে। 
১০.পদি বা বাতনাই
বালারের মতো খুলনা অঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য যে নৌকা ব্যবহৃত হতো এদের নাম হলো বাতনাই বা পদি। বালারের বর্ণনা শুনে যদি অবাক হয়ে থাকো তবে আরও অবাক হবার মতো কথা এখন বলবো। কারণ, এই নৌকাগুলি চালাতে ১৭-১৮ জন মাঝি লাগতো আর এগুলো দৈর্ঘ্যে হতো প্রায় ১৫.২৫-২১.৩৫ মিটার পর্যন্ত। এতে করে ১৪০-১৬০ টন মাল বহন করা যেতো আর ছিলো বিশাল আকারের চারকোণা একটি পাল। কিন্তু এখন এই দৈত্যাকৃতির নৌকাটি আর দেখা যায় না।
আমাদের এই ছোট সুন্দর বাংলাদেশের নদীতে এক সময় বিভিন্ন ধরনের নৌকা ভেসে বেড়াতো। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো দিন দিন এর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অনেক নৌকার নামই চলে গেছে বিলুপ্তির খাতায়। এই নামগুলো এখন শুধু গল্পে বা বইতেই পাওয়া যায়। আমাদের দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে নৌকার এই বিচিত্র ভিন্নতার কিন্তু গভীর একটা সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবার পথেই এই ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যর কথা স্মরণ করে রাখতেই যেন সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে বিলুপ্তপ্রায় ৫০ টি নৌকা নিয়ে একটি চমৎকার প্রদর্শনী হচ্ছে। এই প্রদর্শনীটি চলবে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। কাজেই বাঙালী হিসেবে আমাদের অবশ্যই এই নৌকাগুলো দেখে আসা উচিত। তবে চলো পড়ার পর্ব তো শেষ এবারে সবাই মিলে গিয়ে একবার দেখে আসি আমাদের সেই ঐতিহ্য।
১১.কোষা
দেশের সব অঞ্চলেই কোষা দেখা যায়। অঞ্চলবিশেষে এর আকৃতি সামান্য পরিবর্তন হয়ে থাকে। আকারে ছোট, অনেকটা পারিবারিক নৌকা বলা যায়। বর্ষাকালে আমাদের চরাঞ্চলগুলোয় এ নৌকার আধিক্য দেখা যায়। একটি কোষা নৌকাতে তিন থেকে আটজনের মতো যাত্রী বসতে পারে। এগুলো খেয়ানৌকা হিসেবেও এখন ব্যবহার করা হয়। কিছু কিছু কোষায় পাল, কোনো কোনোটিতে আবার ছইও থাকে। সাধারণত ভাড়ায়চালিত কোষার ক্ষেত্রে পাল ও ছইয়ের ব্যবহার হয়ে থাকে। কোষা লম্বায় ৬ দশমিক ৪০ থেকে ৯ দশমিক ১০ মিটার, প্রস্থে ১ দশমিক ৭৫ থেকে ৩ দশমিক ৩৫ মিটার হয়ে থাকে। এর মাঝি থাকে একজন। কখনো কখনো দুজনও হয়ে থাকে।
১২.বিক
ফরিদপুর অঞ্চলের মালবাহী নৌকা। প্রায় দুই যুগের বেশি সময় আগে নৌকাটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বহনক্ষমতা ২৫ থেকে ২৮ টন। এতে মাঝি থাকে সাত থেকে ৯ জন। নৌকাটি লম্বায় ১২ থেকে ১৫ দশমিক ২৫ মিটার, প্রস্থে ৩ দশমিক ০৫ থেকে ৩ দশমিক ৮০ মিটার এবং এর গভীরতা দশমিক ৯০ থেকে ১ মিটার। এর পাল দুটি, বৈঠা থাকে ছয়টি। দুই পালের মাঝখানটা একটি বাঁশের সঙ্গে লাগোয়া। নৌকার ছইটি থাকে পেছনের দিকে এবং আকারে অনেক ছোট।
১৩.কলার ভেলা
চার-পাচটি বা তারও বেশি কলা গাছ একসাথে বেধে তৈরী করা এক ধরনের অস্থায়ী জলযান । কম খরচে তৈরী করা যায় বলে গ্রামবাংলায় এর ব্যপক ব্যবহার রয়েছে । মৃতদেহ সৎকারের কাজেও ব্যবহার করা হত একসময়ে।
১৪.ছিপ
১৫.বালাম
১৬.টেডি বালাম
১৭.পাতাম 
১৮.সরেঙ্গা

১৯.বাছারি 
২০.পানসি নাও

বর্ষায় ভাটি অঞ্চলে নাইওরি বহনে সুনামগঞ্জের গস্তি নাও এখনো ধরে রেখেছে তার জনপ্রিয়তা। কুটুমবাড়ি বা মামাবাড়িতে বেড়ানোর জন্যও এর কদর আছে। হাওর এলাকায় একে ‘ছইয়া’ বা ‘পানসি নাও’ বলে।
প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এটি মূলত ভাটি এলাকার নৌকা। মালিকরা নিজেদের ডিজাইনে স্থানীয় মিস্ত্রি দিয়ে এ নৌকা তৈরি করেন। খরচ পড়ে ইঞ্জিনসহ ৪০-৬০ হাজার টাকা। এতে ১০-১২ জন লোক ধরে। নৌকার ভেতরে আয়েশ করে বসার জন্য বিছানা-বালিশও রাখা হয়। নৌকার গায়ে মিস্ত্রিরাই ফুটিয়ে তোলেন জলজীবনের নানা ছবি। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, দিরাই, শাল্লা, তাহিরপুর, ছাতকসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্ষা মৌসুমে অনেক গস্তি নাও চোখে পড়ে। সারাদিনের জন্য একটি গস্তি নাওয়ের ভাড়া পড়তে পারে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা।

২১. খেয়া

সাধারণত ছোট নদীতে মানুষ বা মাল-সামাল. ও অন্যান্য প্রাণী পার করতে ব্যাবহৃত হয়। 
২২.শ্যালো নৌকা
১৯৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশে নৌকায় মোটর লাগানো শুরু হয়। এর ফলে নৌকা একটি যান্ত্রিক নৌযানে পরিণত হয়। এ যান্ত্রিক নৌকাগুলো ‌‌‌শ্যালো নৌকা নামে পরিচিতি লাভ করে ; কেননা পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত শ্যালো পাম্পের (Shallow Pump) মোটর (Motor) দিয়ে স্থানীয় প্রযুক্তি দিয়ে এসব নৌকা চালানোর ব্যবস্থা করা হয়।

নাটোরের ঐতিহ্যবাহী মুখানাচ

অর্ধবঙ্গের মহারানী ভবানীর নাটোর জেলা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বর্ণিল ধারায় সমৃদ্ধ। এ অঞ্চলে চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে মূলত শিব ও কালির পূজাকে কেন্দ্র করে মুখা নাচ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকের তালে তালে নির্দিষ্ট পোশাক ও চরিত্রানুযায়ী মুখোশ পরিধান করে শারীরিক কসরতের প্রয়োগে পরিবেশিত এই নাচ স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। নাটোর জেলার সিংড়া থানাধীন শেরকুল ইউনিয়নের অন্ত্যজ শ্রেণীর অধিবাসীরা লোকিক দেবতা শিব ও কালীর পূজাকে কেন্দ্র করে মুখানাচের আয়োজন করে থাকে। বৈশাখ মাসের ১২ তারিখ উৎসবের সূচনা হয়। এদিন দিবাগত সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর বানপাট ও আসন জাগানো হয়। একদল লোক শিবের আসন ও মা কালীর দুটো মুখোশ নিয়ে স্থানীয় শ্রীরামপুর শিব কালীমাতা মন্দিরে আসে। প্রথমে কালিমন্দিরে পূজা দেয়া হয়। বট ও পাকুড় গাছতলায় বেদির উপর মা কালীর মুখোশ দুটো রাখা হয়। স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে বেদিটি তৈরির সময় ১০৮টি মাথার খুলি পুঁতে রাখা হয়েছিল। অতঃপর মা কালীর এক ভক্ত পবিত্র হয়ে মন্ত্রপাঠ করে পূজা সম্পন্ন করেন। পূজা শেষে লোকজন মিস্ত্রিপাড়ার বাড়ির আঙিনায় এসে জমায়েত হয়। চারদিক দর্শক পরিবেষ্টিত স্থানে শুরু হয় মুখা নাচ।
মুখা নাচ বিভিন্ন চরিত্রের ছোট ছোট পর্বের ধারাবাহিক পরিবেশনা। বাদ্যযন্ত্র কেবল ঢাক। নাম মুখা নাচ হলেও এর পরিবেশনায় নাট্যিক উপাদান যথেষ্ট পরিমাণে উপস্থিত। চরিত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট পোশাক ও মুখোশ লাগিয়ে হনুমান নৃত্য, বাঘ ও শিকারি নৃত্য, লাস্যনৃত্য, রাক্ষস নৃত্য, কৌতুক নৃত্য, লব-কুশ নৃত্য, রাম-লক্ষণ-সীতা রাবণ নৃত্য প্রভৃতি পর্ব একাধিক কুশীলব কর্তৃক পরিবেশিত হয়। সাধারণত মধ্যরাত পর্যন্ত নাচ চলতে থাকে। ১৩ বৈশাখ বেলা দশটার দিকে পরবর্তী দিনের কৃত্য শুরু হয়। বিভিন্ন পাড়ার ভক্তরা একযোগে আমের ডাল নিয়ে হাজরা নাচ নাচতে নাচতে মন্দির প্রাঙ্গণে জমায়েত হয়। এ সময় একজন সন্যাসী ভক্তদের কানে মানসা অর্থাৎ তন্ত্রমূলক কথা বলে। এ সময় ঢাকের শব্দ বাড়তে থাকে, সেই সঙ্গে ভক্তদের উদ্দাম নৃত্য শুরু হয়। ঢাক বাজনার তালে তালে তাণ্ডব নৃত্যের এক পর্যায়ে ভক্তদের মধ্যে কেউ কেউ উন্মাদের মতো হয়ে যায়। নির্দিষ্ট সময় পর সব হাজরা ও ঢাকি মিলে শিব ও কালী মন্দিরকে ঘিরে সাত পাক দেন। অতঃপর তারা নৃত্য সহযোগে পুরো গ্রাম প্রদক্ষিণ করতে বের হন। এক একটি পাড়ায় আসার পর নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রাবিরতি হয় এবং উৎসবমুখর পরিবেশে আগের রাতের ন্যায় মুখা নাচ পরিবেশিত হয়। বিকেল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন স্থানে এরূপ নাচ চলতে থাকে। পুরো এলাকা প্রদক্ষিণ শেষ হলে সব ভক্ত হরিবাড়ি নামক মন্দিরে মিলিত হয়।
এখানে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের সহস মানুষের সামনে মুখা নাচ প্রদর্শিত হয়। মূলত এ স্থানে নাচের মাধ্যমেই মুখানাচ পর্বের সমাপ্তি হয়। পরদিন গ্রামের মানুষ ভোগ নিয়ে শিব কালী মন্দিরে আসেন। একই সঙ্গে শিব ও কালী মন্দিরে দুইজন ব্রাহ্মণ পৃথকভাবেপূজা করেন। সবশেষে পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। নাটোর জেলার সিংড়া থানার শেরকুল ইউনিয়নের মুখা নাচ ও উৎসব উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন স্থান ও পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও লোকজন এসে থাকেন। এটি এ অঞ্চলের একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

শাঁখারিবাজারের শঙ্খশিল্প

বুড়িগঙ্গার উত্তর পাড় থেকে তিনশ গজ দূরে দশ ফুট প্রশস্ত একটি গলিই শাঁখারিবাজার। গলির বাড়িঘরের কাঠামোর সঙ্গে ঢাকার অন্য অঞ্চলগুলোর কোনো মিল নেই। একই বাড়িতে বসত, কর্মগৃহ এবং দোকান। বাজারের ভেতর সারিবদ্ধভাবে অনেক বাড়িঘর এবং তার সম্মুখের শাঁখারি দোকানের পসরা। সঙ্গে চা, শিলপাটা, স্ক্রিনপ্রিন্টের দোকান। রোদের আলো ভেতরে প্রবেশ করে না। ভ্যাপসা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। বেশ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। তার ভেতর শাঁখারিরা বসে শঙ্খের গহনা তৈরি করেন। পাশাপাশি আরো অনেক লোকশিল্প ও লোকশিল্পকেন্দ্রিক পেশাদার মানুষের বসবাস ওই এলাকায়। তাঁতিবাজার, পল্লীটোলা (কাঁসারী), সূত্রাপুর (কাঠমিস্ত্রি), বেনিয়ানগর (স্বর্ণকর), কুমারটুলী ইত্যাদি। জানা যায়, মুঘল আমল থেকে শঙ্খশিল্পীরা বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে আবাস গড়ে তোলেন। শঙ্খ শিল্পায়ন নবশাখ শ্রেণীভুক্ত শঙ্খবণিক সমপ্রদায়ের বৃত্তি বা পেশা। শঙ্খ মানুষের পুরনো স্মৃতিবাহী একটি উপাদান। কারণ শাঁখা, সিঁদুর সনাতন হিন্দু ধর্মের সদস্যদের ব্যবহৃত চিহ্ন। হিন্দু সধবা নারীর জন্য হাতের শাঁখা অপরিহার্য। বিয়ের সময় হিন্দু মেয়েদের গায়ে হলুদ দিয়ে ধর্মীয় আচার পালনের মাধ্যমে নবপরিণীতাকে শাঁখা পরানো হয়। সুতরাং শাঁখা হিন্দু নারীদের বৈবাহিক অবস্থার ইঙ্গিতবাহী স্বামীর অস্তিত্ব প্রকাশ এবং দাম্পত্য সুখের পরিচায়ক। আবার স্বামীর প্রয়াণে হাতের শাঁখা ভেঙে ফেলা হয়। শাঁখার ব্যবহার দেখা যায় মন্দির কিংবা গৃহে পূজার উপকরণ হিসেবে। সেগুলো হলো বাদ্যশঙ্খ এবং জলশঙ্খ। শাঁখারিরা পেশার সঙ্গে ধর্মের ঘনিষ্ঠতা অর্থনৈতিক লাভ-লোকসানের পাশাপাশি নিজেদের পেশাকে পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। গবেষকদের ধারণা, প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ ভারতে শঙ্খশিল্পের উদ্ভব। কালক্রমে ঢাকা শহর শঙ্খশিল্পের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। শঙ্খশিল্পকে কেন্দ্র করে অতীতে দাক্ষিণাত্য, ঢাকা, বরিশাল, বগুড়া, নদীয়া, মাদ্রাজ, কলকাতা, রংপুর, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে এক বিশেষ শিল্পসমাজ বিকশিত হয়। এ শিল্পের সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে জড়িত। শঙ্খশিল্পের বিকাশে অর্থনৈতিক ও পৌরাণিক ইতিহাস জড়িত। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রুচিবোধের মাধ্যমে শঙ্খশিল্পের ঐতিহাসিক পরিচয় ফুটে ওঠে। এক সময় দাক্ষিণাত্যের শিল্পীরা একে ‘পারওয়া’ নামে অভিহিত করতেন। ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন- ভগ্নস্তূপ থেকে শঙ্খশিল্প আবিষ্কার হয়। ঐতিহাসিক জেমস হরনেল লিখেছেন যে, দক্ষিণ ভারতের মাননার উপসাগরের তীরে শঙ্খশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকে। তখন গ্রিক ও মিশরীয় বণিকদের মাধ্যমে তামিলের শঙ্খ রপ্তানি হত। তবে তামিলনাড়ু, দাক্ষিণাত্য, গুজরাট এবং ঢাকায় শঙ্খশিল্পের চূড়ান্ত প্রসার ঘটে। পূর্ববঙ্গের নারীরা দেবালয়ে সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত শঙ্খের অলঙ্কার ব্যবহার করতেন। বাংলার মেয়েদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শঙ্খের গহনা। বরিশাল, দিনাজপুর, সিলেট, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলে এ শিল্পের ছোট ছোট কারখানা গড়ে ওঠে। দেবী দুর্গার জন্য উৎকৃষ্টতম পরিধানের অলঙ্কার ছিল এই শঙ্খ। ট্যারাভিয়ান তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন সপ্তদশ শতকে ঢাকা এবং পাবনা শহরে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তখন তাদের বাসগৃহ ছিল অত্যন্ত স্বল্প আয়তনের। ঘরগুলো অনেক স্থানে ছিল একতলা এবং প্রধানত দোতলা। নিচ তলায় শঙ্খশিল্পের কারখানা এবং দোতলাকে তারা শোবার ঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন। ঐতিহাসিক কেদারনাথ মজুমদারের ‘ঢাকার বিবরণ’ (১৯১০) গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে সে সময় ঢাকার কারখানার জন্য শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকা থেকে তিন-চার লাখ টাকার শঙ্খ আমদানি করা হতো। শঙ্খগুলোর ছিল তিতকৌড়ি শঙ্খ (লঙ্কা দ্বীপ), পটী শঙ্খ (সেতুবন্ধ বাগেশ্বর), ধলা শঙ্খ (সেতুবন্ধ বাগেশ্বর), জাহাজী শঙ্খ (সেতুবন্ধ বাগেশ্বর), গুড়বাকী (মাদ্রাজ), সরতী, দুয়ানী পটী (মাদ্রাজ), আলাবিলা শঙ্খ, জলী শঙ্খ (মাদ্রাজ)।শাঁখারিদের অর্থনৈতিক অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে শঙ্খশিল্পের ওপর। তারা শঙ্খের অলঙ্কার তৈরির জন্য কয়েক প্রকারের শঙ্খ ব্যবহার করে। এগুলো হলো_ তিতপুটি, রামেশ্বরী, জামাইপাটি, পাঁজি, দোয়ানি, মতি ছালামত, পাটী, গায়বেশী, কাব্বাম্বী, ধনা, জাডকি, কলকো, নারাখাদ, খগা, তিতকৌড়ি, গড়বাকী, জাহানী, সুর্কীচোনা, সরতী, আলাবিলা প্রভৃতি। এসব শঙ্খের প্রাপ্তিস্থল শ্রীলঙ্কা, মাদ্রাজ এবং কঙ্বাজারের উপকূল।
বর্তমানে বাংলাদেশে সাদা রঙের ঝাঁঝি, হলদে রঙের পাটি, পীত বর্ণেল কাচ্চাস্বর, অব হোয়াইট, ডেড শেল বা ধলা প্রভৃতি পাওয়া যায়। শঙ্খ কাটার জন্য ইস্পাতের করাত লাগে। শঙ্খের মাঝামাঝি চিকন পানির ধারা পড়লে ইস্পাতের সঙ্গে ঘর্ষণ লেগে পুরো ঘর বাষ্পের আকার ধারণ করে। ফলে কাটায় শ্রমিকরা স্যাঁতসেঁতে ঘরে বসে কাজ করে। এ কারণে পুরুষ শিল্পীরা অনেক সময় গুল ও নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে। এর সঙ্গে নারী শ্রমিকদের সর্বাধিক অংশগ্রহণ রয়েছে। নারীরা সাধারণত শঙ্খ কাটার পর নকশা ও পলিশ করার কাজের সঙ্গে জড়িত। শঙ্খশিল্পের কাজের মধ্যে কুরা ভাঙা, গেঁড়াপাড়া, ঝাঁপানি, শাঁখা কাটাই, গাঁড়াসাজি, ডিজাইন করা, মালামতি করা ও পুটিং দেয়া। বর্তমানে শাঁখের করাতের বদলে বৈদ্যুতিক করাত ব্যবহার হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের শাঁখের করাত। একজন দক্ষ শিল্পী দিনে ১৫/২০ জোড়া শঙ্খ পণ্য তৈরি করতে পারেন। তাতে তার দিনে একশ পঞ্চাশ থেকে দুইশ টাকা আয় হয়। শঙ্খের মূল্য প্রতি হাজার পিস ১৩ থেকে ১৫শ ডলার। এক হাজার পাটি ১২শ ডলার। বাংলাদেশের শঙ্খ ভারত, পাকিস্তান, বার্মা, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

চড়ক পূজা

প্রতিবছরেই ২শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী ভয়ঙ্কর গা শিউরে ওঠা চড়ক উত্সব পালন হয়ে থাকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। ফল পূজা, কাদা পূজা, নীল পূজার মতো সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন পূজা শেষে হয় এই ভয়ঙ্কর চড়কপূজা। চড়ক পূজায় পিঠে বাণ (বিশেষ বড়শি) ফুড়িয়ে চড়ক গাছের সঙ্গে বাঁশ দিয়ে তৈরি করা বিশেষ চরকার ঝুলন্ত মাথায় দড়ির সঙ্গে বেঁধে দেয়া হয় পিঠের বড়শি। আর বাণবিদ্ধ সন্ন্যাসীরা ঝুলতে থাকে শূন্যে। রাতে নীলপূজার পর সন্ন্যাসীরা সবাই থাকেন নির্জলা উপোস। পরদিন বিকালে চড়কপূজা শেষে উপোস ভাঙেন তারা।
প্রথমে বালা (শিবপাঁচালী পাঠক) এসে মন্ত্র পড়া শুরু করলে, সন্ন্যাসীরা শিবধ্বনি দিতে দিতে নদীতে স্নান করতে যান। স্নান করে ফেরার সময় প্রত্যেকে মাটির কলসি ভরে জল আনেন। এরপর চড়ক গাছের গোড়ায় গোল হয়ে দাঁড়ান সন্ন্যাসীরা। আবারও শিবপাঁচালী পাঠ করতে লাগেন বালা। এবার সন্ন্যাসীরা সবাই চড়ক গাছে জল ঢেলে ভক্তি জানিয়ে প্রণাম করে চলে যান ফাঁকা একটি জায়গায়। সেখানে তাদেরকে বাণ বিদ্ধ তথা পিঠে বর্শি পোঠানো হয়। জলজ্যান্ত মানুষরা (সন্ন্যাসী) নিজের শরীর বানে (বড়শি) বিঁধে চড়ক গাছে ঝুলে ২৫ ফুট ওপরে শূন্যে ঘুরেন। সন্ন্যাসীর আশীর্বাদ লাভের আশায় শিশুসন্তানদের শূন্যে তুল দেন অভিভাবকরা। সন্ন্যাসীরা শূন্যে ঘুরতে ঘুরতে শিশুদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেন। অনেক সময় কোলেও তুলে নেন। এক হাতে থাকা বেতের তৈরি বিশেষ লাঠি ঘোরান। অন্য হাতে দর্শনার্থীদের উদ্দেশে বাতাসা ছিটান ঝুলন্ত সন্ন্যাসীরা। দেবাদিদেব-মহাদেব শিবঠাকুরের সন্তুষ্টি লাভের আশায় প্রতিবছর এদিন এই নরক যন্ত্রণা ভোগ করেন সন্ন্যাসী শিবভক্তরা। তাদের বিশ্বাস—এ জগতে যারা স্বেচ্ছায় শিবঠাকুরের সন্তুষ্টি লাভের জন্য এত কঠিন আরাধনার পথ বেছে নিয়েছেন, পরলোকে শিবঠাকুর তাদের স্বর্গে যাওয়ার বর দেবেন।

চড়কপূজার সময় : চৈত্র মাসের শেষ থেকে বৈশাখ মাসের প্রথম পর্যন্ত ভক্তরা মহাদেব শিবঠাকুরের আরাধনা করেন। মহাদেবের সন্তুষ্টি লাভের আশায় সপ্তাহব্যাপী নানা পূজার আয়োজন করেন তারা। এরই সর্বশেষ আয়োজন চড়কপূজা। প্রতিবছর ভারতীয় পঞ্জিকার ২ বৈশাখ ও বাংলাদেশের ৩ বৈশাখ এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

চড়কপূজার ইতিহাস : এই ঐতিহাসিক চড়কপূজা কবে কীভাবে শুরু হয়েছিল, তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। তবে জনশ্রুতি রয়েছে, ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা এই পূজা প্রথম শুরু করেন। এই রাজবংশের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, আজকের মহেশপুর জেলা একসময় সুলতানপুর পরগনা নামে পরিচিত ছিল। সুলতানপুর পরগনার শাসনকর্তা ছিলেন সূর্য মাঝি নামের এক জমিদার। সে সময়ে এ এলাকারই ১৭ ব্রাহ্মণ চক্রান্ত করে সূর্য মাঝিকে হত্যা করেন এবং পরগনার মালিকানা দখল ও ভাগ করে নেন। সে সময়ের মহেশপুরের জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ হলেন হরিনারায়ণ চৌধুরী। তার সময় জমিদাররা মহেশপুরের প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেন। দেবতাদের সন্তুষ্ট রাখতে বিভিন্ন ধরনের পূজার আয়োজন করেন তারা। জনশ্রুতি আছে, তত্কালীন সময়ে কপোতাক্ষ ও বেতনা নদীর সংযোগস্থলে ধীরে ধীরে একটি নতুন চর জেগে ওঠে। এই চরে স্বয়ং আবির্ভূত হন মহেশ্বর, যার অন্য নাম বুড়ো শিব। তার নামানুসারেই প্রতিষ্ঠিত হয় মহেশ্বর (শিব) মন্দির। এর কিছুকাল পর ফতেপুর কপোতাক্ষ নদের পাশে আরও একটি চর জাগে। সেই চরে ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে ফতেপুর এলাকার জমিদার বংশের লোকজন অন্যান্য পূজার সঙ্গে চড়কপূজা শুরু করেন। রাজপরিবারের লোকজন এই পূজা আরম্ভ করলেও চড়কপূজা কখনই রাজ-রাজড়াদের পূজা ছিল না। এটি ছিল নিতান্তই হিন্দু সমাজের লোকসংস্কৃতি। পূজার সন্ন্যাসীরা প্রায় সবাই হিন্দু ধর্মের কথিত নিচু সম্প্রদায়ের মানুষ। এখনও এ পূজায় কোনো ব্রাহ্মণের প্রয়োজন পড়ে না।

সন্ন্যাসীরা জানান, শরীরে বড়শি ফোঁড়ানোর ফলে বড় বড় ক্ষতের সৃষ্টি হলেও রক্ত বের হয় সামান্য। আর এজন্য কোনো ওষুধেরও প্রয়োজন হয় না। ক্ষতস্থানে পূজোয় ব্যবহৃত সিঁদুর টিপে দিলেই হয়। এই পূজাকে কেন্দ্র করে ৫ দিন ধরে চলে লোকজ মেলা। ৩ বৈশাখ চড়কপূজা অনুষ্ঠিত হলেও পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে ৫ বৈশাখ পর্যন্ত চড়ক মেলা চলে।
ছবি

চড়ক পূজা

if (window.ads_65c7a5a1e4aba21d971ef5c47d68a87f ){ ads_65c7a5a1e4aba21d971ef5c47d68a87f+= 1;}else{ ads_65c7a5a1e4aba21d971ef5c47d68a87f =1;} setTimeout(“showAdsforContent(10147,120,105,’http://www.admaya.in/publisher-show-ads.php’,”+ads_65c7a5a1e4aba21d971ef5c47d68a87f+”,’ads_65c7a5a1e4aba21d971ef5c47d68a87f’)”,1000*(ads_65c7a5a1e4aba21d971ef5c47d68a87f -1)); ads_65c7a5a1e4aba21d971ef5c47d68a87f_10147_position=0;

লক্ষ্ণৌ

আমাদের এই উপমহাদেশের, বর্তমান ভারতীয় উত্তর প্রদেশ  ইউনিয়নের জৌলুসময় এক নগরী লক্ষ্ণৌ(হিন্দিতে: लखनऊ, উর্দুতে: لکھنؤ লাখ্‌নাউ) নবাবী শহর, রাজনীতির নগরী, শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির নগরী, সঙ্গীতের নগরী এবং অপরূপ স্থাপত্যশিল্পের নগরী লখনৌঅযোধ্যার নবাবের লক্ষ্মৌ, ইতিহাসে এই তার জনপ্রিয় পরিচিতি হলেও আজকের ভারতে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক রাজধানী লখনউ

লক্ষ্মৌ-এর সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে নবাব আসফ-উদ-দৌলার নাম। যে লক্ষ্ণৌ নগরী উপমহাদেশে আমাদের সকলের চৈতন্যের সাথী, আবেগের সঙ্গিনী তার  প্রকৃত  রূপকার অযোধ্যার স্বাধীন নবাব আসফ-উদ-দৌলা, নগরীর উত্পত্তি ও নামকরণ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এই প্রশ্নে ভিন্নমত প্রকাশের অবকাশ কোথায়? এখন থেকে অন্তত সোয়া দুই শ’ বছর আগে ১৭৭৫ সালে লক্ষ্ণৌতে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন নবাব আসফ-উদ-দৌলা। তারপর থেকেই লক্ষৌ-এর বহুরূপী বিপুল বিকাশ। বিশেষ করে শিল্প সংস্কৃতিতে দিল্লির সমতুল্য হয়ে উঠতে থাকে লক্ষ্ণৌ
পৌরাণিক কাহিনী কী বলে? রামায়ণে উল্লেখ রয়েছে, রামচন্দ্রের বনবাসের পর তিনি লক্ষ্মণের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এই অঞ্চল। রামানুজ লক্ষ্মণের নাম অনুসারে এর নাম হলো লক্ষ্মনাবতী। এবং ক্রমে অপভ্রংশ হয়ে লক্ষৌতে রূপান্তরিত হলো। আর ভিন্ন একটি মত বলছে: জৌনপুরের মুসলিম শাসক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই নগরী। তার নির্দেশে হিন্দু স্থপতি লখনা নির্মাণ করেন একে। সেই স্থপতি লখনার নামই পরিবর্তিত রূপ নিয়ে লক্ষৌ হয়ে বেঁচে আছে নগরীর জৌলুসময় আবেদনের মধ্যে। তবে নামের ইতিহাসের বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। আর কোনটিই চূড়ান্ত হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনও পায়নি।
কলকাতা থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরত্বে লক্ষ্ণৌ রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে কিন্তু নতুন যে কারো অবাক না হয়ে উপায় নেই। আর দশটা প্রচলিত ছোট কিংবা বড় রেলওয়ে স্টেশনের সাথে একদম মিল নেই এই স্টেশন ভবনের। প্রথম কেউ এলে একেবারে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে হবে। স্টেশন ভবনে সেকালের স্থাপত্যরীতির উঁচু মিনার সম্বলিত নকশা। রাজপ্রাসাদ কিংবা উচ্চ রাজ কার্যালয় বলেই ভ্রম হতে পারে যে কারো। নগরীর বহু এলাকাতেই এখনকার কিংবা আধুনিক মোটর গাড়ির পাশাপাশি চলছে ঘোড়ায় টানা গাড়ি, স্থানীয়ভাবে যাকে বলে টাঙ্গা। এর ঘোড়া ও চালক দেখে মনে হয় না সময়টা আড়াই শ’ বছরের বেশি গড়িয়ে গেছে। কিংবা মনে হয়, এই ঘোড়া আর টাঙ্গার চালক উঠে এসেছে আড়াই তিনশ’ বছর আগের লক্ষ্ণৌ থেকে।
নগরীর চৌক নামক স্থানে রয়েছে বড় ইমামবাড়া অর্থাৎ নবাব আসফ-উদ-দৌলার মূল প্রাসাদ। লক্ষৌতে পদার্পণের নয় বছর পর ১৭৮৪ সালে বড় ইমামবাড়া নির্মাণ করেছিলেন তিনি। চারতলা এই প্রাসাদ যেন এক রহস্যময় জগৎ। বহু সুরঙ্গপথে ভরা এর অভ্যন্তর ভাগ। হিসেবে সামান্য ভুল হলেই রীতিমত বেওকুফ বনে যেতে হবে, অনেক কষ্টে আবার ফিরে পেতে হবে সঠিক পথ। এই প্রাসাদেরই নিচতলায় দরবার ঘরে সমাধিস্থ রয়েছেন নবাব আসফ-উদ-দৌলা ও তাঁর প্রিয়তমা পত্নী। এ কারণে বড় ইমামবাড়ার মূল চত্বরে ঢোকার আগে জুতা খুলে রেখে যেতে হয়। লক্ষ্মৌরের অন্যতম প্রধান উত্সব মহররম। এ সময় বড় ইমামবাড়াসহ পুরো নগরী আলোর বন্যায় ভেসে যায়। দরবার কক্ষে সজ্জিত রয়েছে মহররমের তাজিয়ার অনুকৃতি। প্রাসাদ কমপ্লেক্সের একাংশ রয়েছে শাহী বাওলি জলাধার। এখানে স্বচ্ছ পানির পাতালছোঁয়া বিশাল এক কুয়োকে ঘিরে রয়েছে তিনতলা মনোহর ইমারত। এরই বাঁদিকে আসাফি মসজিদ। মসজিদের মিনার যেন আকাশের নীলকে ছুঁয়ে দেখতে চায়। এখানকার সিঁড়ির বৈচিত্র্য মনোমুগ্ধকর। বড় ইমামবাড়ার প্রধান প্রবেশপথ হাওয়া মহল, গঠনশৈলি ও বিশালত্ব দেখে মন আপনা থেকেই বলে ওঠে: অসামান্য! হাওয়া মহলের উল্টোদিকেই নহবতখানা। নিদারুণ অযত্নের শিকার, তাই ভেঙ্গে পড়েছে। কিন্তু তারপরও নবাবী জৌলুস এখনো যেন ঝরে পড়ছে। হাওয়া মহল থেকে রাস্তার বাঁদিকে একটু এগিয়ে গেলেই বিশাল প্রবেশ তোরণ, রুমি দরওয়াজা। অনবদ্য এর গঠনশৈলী, কারুকাজও চমকে দেয়ার মত। ১৭৮৬ সালে তুরস্কের তত্কালীন রাজধানী ইস্তাম্বুলের দরওয়াজার অনুসরণে এই রুমি দরওয়াজা তৈরি করিয়েছিলেন নবাব আসফ-উদ-দৌলা। তাই এর আরেক নাম টার্কিশ গেট।
রুমি দরওয়াজা পেরিয়ে ৫/৬শ’ গজ দূরেই ছোট ইমামবাড়া, যার পোশাকি নাম হুসেনাবাদ। ১৮৩৭ সালে নবাব মোহাম্মদ আলি শাহ নির্মাণ করেছিলেন ছোট ইমামবাড়া নামের এই প্রাসাদ। তাঁর এবং তাঁর মায়ের সমাধিও রয়েছে এখানে। প্রাসাদের ভেতরটা এখন খুবই শান্ত, একেবারে যাকে বলে পিনপতন নিস্তব্ধতা। অনিন্দ্য সুন্দর সব ঝাড়বাতি ও আরো নানা আলোর বাতি, গিল্টি করা আয়না আর দেওয়ালে চারুময় কারুকাজ দেখে যে কারো চক্ষুস্থির হয়ে যাবে। এই প্রাসাদের কয়েকটি গম্বুজের মধ্যে বড় গম্বুজটি সোনার, অন্তত ওতে সোনার কারুকাজ রয়েছে এমন জনপ্রিয় বহুলশ্রুত জনশ্রুতি রয়েছে। মহররম উত্সবের সময় প্রাসাদের সব ঝাড় লক্তন আর আলোর বাতি এক সাথে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। তখন সে এক আশ্চর্য আলোকময় রাত। নবাব মোহাম্মদ আলি শাহ আরেকটি বিশাল বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন, নাম বারোদুয়ারী। বড় আকারের বারোটি দরজা থাকার কারণেই এর নাম বারোদুয়ারী। তবে সে নাম প্রচলিত নয়, এখন নাম হয়েছে পিকচার গ্যালারি। বড় ধরনের চিত্রশালা হিসেবে গড়ে উঠেছে। নবাবদের লাইফ সাইজ সব প্রতিকৃতি সযত্নে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত এখানে। বারোদুয়ারী থেকে কিছু দূরেই ক্লক টাওয়ার, সুউচ্চ মিনারের মাথায় চারদিকে বিশাল চারটি ঘড়ি বসানো। ১৮৮৭ সালে নবাব নাসির-উদ-দীন হায়দরের নির্দেশ তৈরি এই ক্লক টাওয়ার চরিত্রের দিকে থেকে ব্রিটিশ স্থাপত্য। টাওয়ারের আয়তন কুড়ি বর্গফুট আর ২২১ ফুট উচ্চতায় উঠে একইসাথে চারদিকের মানুষকে সময় জানান দিচ্ছে বিগত সোয়া শ’ বছর ধরে। গান মেটালে তৈরি ঘড়িগুলোর যাবতীয় কিছু এসেছিল লন্ডন থেকে।
লক্ষ্মৌয়ের আরেক বিখ্যাত স্থাপত্য রেসিডেন্সি। এরও নির্মাতা বা মূল প্রতিষ্ঠাতা নবাব আসফ-উদ-দৌলা। ১৭৭৫ সালে ব্রিটিশ রাজ প্রতিনিধি ও পর্যটকদের বিশ্রামাগার হিসেবে এই রেসিডেন্সি কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। তবে শেষ হয়েছিল ১৮০০ সালে নবাব সাদাৎ আলি খানের আমলে। কিন্তু ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় রেসিডেন্সি নামের এই অপরূপ স্থাপত্য। ভাঙ্গাচোরা দেয়াল, ঝুলে থাকা ছাদ, কামানের গোলা আর রাইফেলের গুলির স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে সিপাহী বিপ্লবের সেই ভয়ঙ্কর গৌরব গাথার দুর্দমনীয় দিনগুলোর স্মারক হয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো প্রতি সন্ধ্যায় আলোক সাজে রেসিডেন্সি হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর সুন্দর। এখানে রয়েছে স্মৃতি জাদুঘর আর এর বিপরীতেই শহীদ পার্ক। নতুন লক্ষ্মৌয়ের শুরুর আগেই শাহ নজফ ইমামবাড়া। লক্ষ্মৌতে এখান থেকেই শুরু হয়েছিল সিপাহি বিপ্লবের আগুন। ১৮১৪ সালে গাজী-উদ-দিন হায়দার ইরাকের নজফে হযরত আলীর সমাধির অনুসরণে এই ইমামবাড়া নির্মাণ করান। দেখতে অনেকটা ছোট ইমামবাড়ার মত। লখনউ শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে গোমতী নদী। সন্ধ্যায় অস্তমান রবির আলো ঠিকরে পড়ে গোমতীর বুকে, ভাদ্রের ভরাযৌবনা কিংবা শীতের তন্বী তরুণী গোমতী তখন লালে লাল হয়ে ওঠে। সে যেন সিপাহী বিপ্লবে গৌরবদীপ্ত ভূমিকা পালনকারী নগরী লক্ষ্মৌয়ের রক্তিম আর অগ্নিময় ভূমিকার প্রতিরূপ। লখনউতে জীবন বাজি রেখে সে সময় বিদেশি ইংরেজ বিতাড়নে অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নবাব পরিবারেরই বেগম হজরত মহল। কোন অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করেননি।
গঙ্গার শাখা নদী গোমতী লক্ষ্মৌয়ের ভেতর দিয়ে বয়ে গিয়ে আবার অযোধ্যার বিখ্যাত নদী সরযূর সাথেও মিলেছে। নগর এলাকায় গোমতীর দুই পাড়কে জুড়ে দিয়েছে একাধিক সেতু। নবাবী আমলের সেতু। নবাবদের জনহিতকর চরিত্র ও মানসিকতা এবং সেই আমলেই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ ও সুগম করে তোলার প্রবণতা ফুটে উঠেছে এসব বড় সেতুর স্তরে স্তরে। তুর্কী ও ইরানী স্থাপত্য কৌশল প্রভাবিত তত্কালীন ব্রিটিশ স্থাপত্য রীতিতে নির্মাণ করা হয়েছিল এগুলো।


কিন্তু উত্তর প্রদেশ পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ লক্ষ্মৌয়ের এসব ঐতিহাসিক স্থাপত্যকীর্তি সংরক্ষণে যথেষ্ট যত্নবান নয়। বড় ইমামবাড়া প্রাসাদের বেশিরভাগ সুরঙ্গপথ আজ বন্ধ। সেগুলো খুলে দেয়ার কোন উদ্যোগও নেই। গণপ্রস্রাবাগার বানিয়ে ফেলায় শাহী বাওলিতেও দুর্গন্ধ। তারপরও চুপচাপ পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের লোকজন। তাহলে কি আস্তে আস্তে এসব কিছু ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হবে? এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে চেতনাঋদ্ধ ভারতীয়দের মনে।
এখানে বাঙ্গালিদের একটি আখড়া রয়েছে। ইন্দিরা রোডের রবীন্দ্রপল্লীকে বাঙ্গালিদের আখড়া মনে করা হয়। আড়াইশ’র মত বাঙ্গালি পরিবারের বসবাস এখানে। বাঙ্গালি হিন্দুর লোকচর্চার হেন উত্সব নেই যা সেখানে পালিত হয় না। এখানকার বাঙ্গালিরাও খুব সংস্কৃতিমনা। আর সে তো লক্ষ্ণৌরই ঐতিহ্য, যাকে এক কথায় বলা চলে তাহজিব বা তমদ্দুন, যার মানে কৃষ্টি।
নতুন পুরাতনের এক আশ্চর্য সহাবস্থান চলছে লক্ষ্মৌতে। নগরীর পুরনো এলাকা নতুন যে কাউকে টেনে নিয়ে যাবে তার অতীতের স্মৃতিময় দিনগুলোতে। পাশাপাশি নগরীর বর্ধিত নতুন এলাকা ঘুরলে মন মানতে চাইবে না যে, পুরনো দিনের সেই মায়াময় ঐতিহ্য লালনকারী লক্ষ্ণৌ বলে কিছু টিকে আছে এখনো। নতুন শহরে চকচকে ঝকঝকে কার্পেটিং রাজপথ আর দু’পাশে আধুনিক অট্টালিকা সজ্জিত এভিনিউ অতীতের সেই আবেগস্পর্শী নগরীর কথা ভুলিয়ে দেবার মত। সাহারা শহর নগরীর এমনই একটি অংশ। পুরনো এমনকি নতুন শহরেও আধুনিক মোটরযান আর সর্বাধুনিক মডেলের মহামূল্য বিলাসবহুল মোটরগাড়ির পাশেই চলছে সেই ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গা। অত্যন্ত মসৃণ কার্পেটিং রাজপথে মানুষের গায়ে চাকচিক্যময় পোশাক। তারা যখন টাঙ্গায় সওয়ার হয়, মনে হয়, নবাবী লক্ষ্ণৌতে ফিরে গেছি। পুরনো শহরে রাস্তার পাশে পায়রা ও অন্যান্য পাখির দোকানে উপচেপড়া ভিড়, মুয়াজ্জিনের সুললিত আজানের সুর, শিশু-কিশোরদের লাঠিখেলা আর পায়রা ওড়ানো। সব মিলেমিশে মনে হবে এ যেন সত্যি সত্যিই নবাব আসফ-উদ-দৌলার সময়ে এসে পড়েছি। এখানে ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা চলে টক! টক!! ধ্বনি তুলে। তার পেছনের ছইয়ের তলায় বসলে যে কারো নিজেকে সেই নবাবী আমলের মানুষ বলে ভাবতে কষ্ট হবে না।
পুরনো শহরের খুব নামকরা ব্যবসা কেন্দ্র আমিনাবাদ্। নবাব এমদাদ খান আমিন-উদ্-দৌলার স্মৃতি বহন করছে এই আমিনাবাদ্। পুরনো লক্ষ্মৌতে নবাবী আমলের বাজার। কী নেই এখানে? লক্ষ্মৌয়ের বিখ্যাত সূক্ষ্ম কারুকাজের পোশাক, শাড়ি সালোয়ার, কুর্তা, পাঞ্জাবি, পায়জামা আরো কত কি। খাবারের দোকানে আর হোটেলের সামনের ভাগে ঐতিহ্যময় আর লোভনীয় সব পসরা: প্রাণী আর পাখির মাংসের কাবাব, বিরিয়ানি, মুরগি মুসল্লম।
আধুনিক লক্ষ্মৌয়ের এক সেরা বাণিজ্যিকেন্দ্র হযরতগঞ্জ। মনে হয় সিপাহি বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী বেগম হযরত মহলের স্মৃতিতেই এই নামকরণ। এখানেই উত্তর প্রদেশ বিধানসভা ভবন, বিশাল এলাকা জুড়ে এক ইমারত। পাশেই রাজ ভবন, রাজ্যপালের দপ্তর ও বাসস্থান। হযরতগঞ্জ এবং লক্ষ্মৌ নগরীর বিশাল অংশ জুড়ে যে দৃশ্য তাতে মনে হবে যেন বিদেশ থেকে তুলে এনে এখানে বসানো হয়েছে লক্ষ্মৌকে। দেশী বিদেশি অত্যাধুনিক সব মোটরগাড়ি, চকচকে-ঝকমকে আধুনিক রেস্তোরাঁ, শপিং মল আর তার সাথে চকমকে মানুষের প্রাচুর্য। এ এক অন্য লখনউ
দু’টো সমান্তরাল চারিত্র্য নিয়ে পাশাপাশি বাস করছে লখনউ। পুরনো আর আধুনিকতার মাঝে কোন বিরোধ নেই এখানে। কেউ কাউকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করে না। কারো উপরে কারো চাপাচাপি নেই। কাবাবের সাথে পিত্জার, টাঙ্গার সাথে মার্সির্ডিজের, মুয়াজ্জিনের সুললিত আজানের ধ্বনির সাথে পুরোহিতের মধুর মন্ত্রোচ্চারণের, সূক্ষ্ম কারুকাজের কামিজের সাথে ইউরোপীয় কোটের কোন বিরোধ নেই এখানে। অবাক করা সহাবস্থানের এমন নজির কেবল আমাদের এই উপমহাদেশের কেন, গোটা দুনিয়াতেই বিরল। কিন্তু তারপরও ইতিহাসপ্রেমী চেতনায় সমর্পিতপ্রাণ মানুষ ছুটে যায় সেই পুরনো লক্ষ্মৌতে, অযোধ্যার সঙ্গীতপ্রেমী স্বাধীন নবাব আসফ-উদ-দৌলার লক্ষ্মৌতে। রাজনৈতিক ইতিহাস আর সঙ্গীত ও সংস্কৃতির ইতিহাসের খোলা জানালায় বাতাস যেন ডেকে বলে যায়- হ্যাঁ! ঐ তো আসল লখনউ!!
মুহ: আরিফ-উদ-দৌলা-লেখাটিতে আনন্দবাজার পত্রিকার সাহায্য নেয়া হয়েছে

মাঘী পূর্ণিমা

মাঘী পূর্ণিমা কথাটি উচ্চারণমাত্র এ দেশের বৌদ্ধ সংস্কৃতির কথা মনে আসে। বিভিন্ন অঞ্চলের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঘী পূর্ণিমা পালন করে থাকে। ঢাকার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাউজান ও ঠেগরপুনিতে এই পূর্ণিমা উপলক্ষে মেলা বসে। মাঘী পূর্ণিমায় মূলত বুদ্ধপূজা, ভিক্ষুসংঘের পিণ্ডদান, শীল গ্রহণ, ধর্মসভা, প্রদীপপূজা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এদিন বৌদ্ধ নর-নারীরা বিহারে বিহারে গিয়ে বুদ্ধমূর্তির সামনে প্রদীপ ও বাতি জ্বালায়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতে, এদিন বুদ্ধ শিষ্যদের দুঃখজয়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর এদিনই তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, তাঁর ধর্ম সম্পর্কে শিষ্যদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই।